নিজস্ব প্রতিবেদক:
সন্তানদের ঈর্ষণীয় সাফল্য আর অঢেল প্রতিপত্তির ভিড়ে একজন মায়ের নিঃসঙ্গ ও বিভীষিকাময় মৃত্যুর খবর আজ পুরো সমাজকে এক কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। চারপাশের ঝলমলে উন্নয়ন আর সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানদের ভিড়ে অবহেলায়, চরম নিঃসঙ্গতায় ফ্ল্যাটের ভেতর মারা গেছেন এক বৃদ্ধা মা। যখন তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তখন তা গলিত ও বিকৃত। যে সন্তানরা সমাজের উঁচুতলায় বসবাস করেন, মায়ের প্রতি তাঁদের এই চরম অবহেলা কেবল এক মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং আমাদের প্রচলিত আইনি কাঠামোর এক মস্ত বড় পরাজয়।
আমাদের দেশে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ রয়েছে, কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা অনেক। কোনো সন্তান যদি মাতা–পিতাকে অবহেলা করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তবে প্রচলিত আইনে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু এর ফলে সেই অপরাধী সন্তানের দেওয়ানি অধিকার—বিশেষ করে মাতা-পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার—বাতিল হওয়ার স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। এটি আইনের এক মারাত্মক ফাঁক।
একজন সন্তান মাতা-পিতাকে তিলে তিলে অবহেলা করে মেরে ফেলবে, আবার সেই মাতা-পিতার রেখে যাওয়া বিপুল ধন-সম্পত্তির আইনি অংশীদারও হবে—এমন অন্যায্য ও অনৈতিক দ্বিমুখী নীতি কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না। ফৌজদারি আদালত সন্তানকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু ওই মাতা-পিতা মারা যাওয়ার পর প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেই সন্তানটি ঠিকই সম্পত্তির সমবণ্টন পেয়ে যায়।
আধুনিক সময়ে এসে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয় ও ফ্লোরিডার মতো বহু অঙ্গরাজ্য এই আইনের পরিধি আরও বাড়িয়েছে। বর্তমানে সেখানে শুধু খুন নয়, কোনো সন্তান যদি প্রবীণ মাতা-পিতাকে মারাত্মক অবহেলা, শারীরিক নিগ্রহ বা আর্থিক শোষণ করে, তবে আদালত তাকে উত্তরাধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত বা বারিত করার আদেশ দেন। পশ্চিমা আইন যেখানে প্রবীণদের সুরক্ষায় দেওয়ানি ও জদারি বিধানের এমন যুগপৎ প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে, সেখানে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে।
এই ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয় ও আইনি জটিলতা নিরসনে এখন সময়ের দাবি আমাদের দেশেও ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ সাপেক্ষে আদালত যাতে তাৎক্ষণিকভাবে ওই সন্তানের উত্তরাধিকারের দেওয়ানি অধিকার কেড়ে নেওয়ার এখতিয়ার বা সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, আইনে সেই স্পষ্ট ধারা যুক্ত করা দরকার।


