ইসহাক ইসলাম জায়ান
বয়স ৭৩ বছর। এ বয়সে অনেকেই অবসরে সময় কাটান। কিন্তু চাঁদপুর সদর উপজেলার তরপুচণ্ডী ইউনিয়নের আনন্দবাজার গ্রামের মো. আবুল খায়ের বেপারী এখনো কর্মব্যস্ত। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে নৌকা তৈরির কারিগর হিসেবে কাজ করছেন তিনি। নৌকা তৈরির কাজ না থাকলে জীবিকার তাগিদে ছুটে যান নদীতে মাছ ধরতে। পরিশ্রম আর আত্মনির্ভরশীলতাকে সঙ্গী করে এভাবেই চলছে তার জীবন।
মৃত জয়নাল আবদীন বেপারীর ছেলে আবুল খায়ের বেপারীর সংসারে রয়েছে তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। দীর্ঘ কর্মজীবনে উপার্জিত অর্থ দিয়ে সন্তানদের বিয়ে দিয়েছেন, গড়ে তুলেছেন বাড়িঘর। সংসারের দায়িত্ব পালন করে এখনো নিজের কাজ নিজেই করে যাচ্ছেন তিনি।
প্রায় চার দশক আগে নৌকা তৈরির কাজ শুরু করেন আবুল খায়ের। কাজ শেখার সময় দৈনিক মজুরি পেতেন ২০০ টাকা। বর্তমানে সেই মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০০ টাকায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগে দৈনিক ২০০ টাকা আয় করে সংসারের খরচ মেটানোর পর হাতে থাকত বড়জোর ৫০ টাকা। আর এখন দৈনিক ১২০০ টাকা আয় থেকে প্রায় ৮০০ টাকা খরচ বাদ দিয়ে ৪০০ টাকা থাকে।
বর্তমানে নৌকা তৈরি করাই তার প্রধান পেশা। নিজের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও নৌকা তৈরি করেন তিনি। নির্দিষ্ট মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন এই কারিগর। তার দাবি, এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই নৌকা তৈরির কাজ পান। তবে কাজ না থাকলে নদীতে মাছ ধরে সংসারের জন্য আয় করার চেষ্টা করেন।
কাঠ থেকে নৌকা তৈরির কারিগরি একটি নৌকা তৈরি করা সহজ কাজ নয়। কাঠ নির্বাচন থেকে শুরু করে কাঠ কাটা, জোড়া লাগানো, ঘষামাজা ও নৌকার বিভিন্ন অংশ নিখুঁতভাবে তৈরি করতে প্রয়োজন হয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। প্রায় ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় এসব কাজে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন আবুল খায়ের।
নৌকা তৈরিতে তিনি মেহগনি, কাঁঠাল ও তালগাছের কাঠ ব্যবহার করেন। পাশাপাশি প্রয়োজন হয় লোহা, আলকাতরা, মাইটা তেল, পাতাম ও তারকাঁটার। কাজের জন্য তাঁর নিজস্ব যন্ত্রপাতিও রয়েছে। হাতুড়ি, বাটালি, করাত, হারাইস, রন্দা ও শাবলসহ প্রায় ২০ ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করেন তিনি।
আবুল খায়ের জানান, ২২ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি নৌকা তৈরি করতে প্রায় ১৫ দিন সময় লাগে। এতে কাঠ কিনতেই খরচ হয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। শ্রম ও অন্যান্য উপকরণসহ একটি নৌকা তৈরিতে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। একটি নৌকা তৈরিতে লাগে প্রায় তিন কেজি পাতাম ও চার কেজি পেরেক।
দীর্ঘ কর্মজীবনে শতাধিক নৌকা তৈরি করেছেন বলে জানান তিনি। প্রতিটি নৌকা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার অভিজ্ঞতা, শ্রম ও দক্ষতা।
বদলেছে সময়, বদলেছে জীবনের হিসাব একসময় গ্রামবাংলার মানুষের যাতায়াত ও জীবিকার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত না থাকায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত, মাছ ধরা ও বিভিন্ন প্রয়োজনে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হতো মানুষকে। ফলে নৌকা তৈরির কারিগরদের কাজও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
আবুল খায়েরের অভিজ্ঞতায়, সময়ের সঙ্গে নৌকার ব্যবহার ও চাহিদার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। তবে তার এলাকায় এখনো নৌকা তৈরির কাজ পাওয়া যায়। নদী ও জলপথের সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার সম্পর্ক থাকায় তার মতো কারিগরদের শ্রমের প্রয়োজন রয়েছে।
সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও নিয়মিত কাজ করার সক্ষমতা নিয়ে সন্তুষ্ট আবুল খায়ের। নিজের জীবন সম্পর্কে তিনি বলেন, “আল্লাহ আমাকে ভালো রেখেছেন। এখনো কাজ করতে পারি, খাওয়াদাওয়া করতে পারি, চলাফেরা করতে পারি। এ জন্য আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া। আল্লাহ আমাকে যে অবস্থায় রেখেছেন, তাতেই আমি আলহামদুলিল্লাহ বলি।”
আবুল খায়েরের একটাই স্বপ্ন, পবিত্র কাবা শরিফ দেখা দীর্ঘ কর্মজীবনে সংসারের দায়িত্ব পালন করেছেন, সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন এবং নিজের শ্রমে জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন। জীবনের এই পর্যায়ে এসে তাঁর চাওয়া-পাওয়ার হিসাবও খুব বেশি নয়। তবে মনের গভীরে রয়েছে একটি বিশেষ স্বপ্ন—পবিত্র কাবা শরিফ নিজের চোখে দেখা।
আবুল খায়ের বলেন, “আমার একটাই ইচ্ছা—পবিত্র কাবা শরিফ একবার নিজের চোখে দেখব। আল্লাহ যেন সেই সুযোগ দেন।”জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও কর্মে অবিচল আবুল খায়ের বেপারীর গল্প শুধু একজন নৌকা তৈরির কারিগরের জীবনসংগ্রামের গল্প নয়; এটি নিজের শ্রমের ওপর ভরসা রেখে বেঁচে থাকা, পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকার এক বাস্তব চিত্র। বয়স তার ৭৩, কিন্তু কাজের প্রতি আগ্রহ আর বেঁচে থাকার প্রত্যয় এখনো অটুট।


