প্রধান শিক্ষক ‘গা’ ডাকা, শিক্ষক-কর্মচারিদের অনাস্থা

শামীম হাসান:

গত প্রায় তিন মাস যাবৎ গা ঢাকা দিয়ে পলাতক আছেন ফরিদগঞ্জ এআর পাইলট মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিতর্কিত প্রধান শিক্ষক মোঃ রফিকুল আমিন (কাজল)। প্রধান শিক্ষকহীন বিদ্যালয়টিতে শিক্ষাকর্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ায় ও শিক্ষকরা দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন না পাওয়ায় এবার প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে অনাস্থা জানিয়েছেন স্কুলের সকল শিক্ষক-কর্মচারি। গতকাল বিষয়টি স্কুলের একাধিক শিক্ষক চাঁদপুর কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন। তারা জানান গত ৩০ সেপ্টেম্বর স্কুলের টিচার্স রুমে যৌথসভা করে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ স্কুলের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রধান শিক্ষকের পরিবর্তে নতুন কাউকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাচ্ছেন শিক্ষকগণ। শিক্ষকদের অনাস্থার লিখিত অভিযোগ ৩০ সেপ্টেম্বর ই-মেইলে এবং ১ নভেম্বর ডাকযোগে জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো হয়েছিলো বলেও জানান স্কুলের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। যদিও গত ১ মাসেও তার কোন সমাধান বা পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি জেলা প্রশাসনকে। জ্যেষ্ঠ শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, মাসখানেক আগে জেলা প্রশাসক অফিস থেকে চিঠি পেয়েছে মর্মে একজন কর্মককর্তা আমাকে ফোন করে মৌখিকভাবে আরও বিস্তারিক জানতে চান। আমি সকল সত্য ঘটনা খুলে বলব। তারপর থেকে দৃশ্যমান আর কোন পদক্ষেপ নিতে দেখিনি প্রশাসনকে। আমাদের বিশ্বাস ছিলো জেলার অভিভাবক জেলা প্রশাসক মহোদয়ে এর একটি সুরাহা করবেন। কিন্তু গত ১ মাসেও আমরা এর কোন সমাধান না পাওয়ায় হতাশ হলাম। স্কুলের ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের দাবী, অদৃশ্য কারনে সময় ক্ষেপণ করে আওয়ামীলীগের শীর্ষ স্থানীয় পদ বহণকারী এই প্রধান শিক্ষককে রক্ষা করে যাচ্ছেন খোদ প্রশাসনই!

স্কুলের একজন অভিভাবক মোস্তফা কামাল জানান, পলাতক প্রধান শিক্ষকের পরিবারের একজন সদস্য দু’মাস আগেই বলেছিলেন, কাজল মাস্টার (রফিকুল আমিন) বিভিন্ন দপ্তরে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে রেখেছেন। কেউ তার কিছুই করতে পারবে না। সে জন্যই হয়তো নিরব সকল প্রশাসন। অন্যথায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক তিন স্তর থেকে তিন ধরণের লিখিত অভিযোগ জানানোর পরও একজন বিতর্কিত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোন প্রকার দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়াটা আশ্চর্যজনক ঘটনা। তিন মাস ধরে একটি স্কুলের সাথে যা ঘটছে তা মোটেই কাম্য নয়।

স্কুলের অপর অভিভাবক মানিক চন্দ্র দাস বলেন, এই প্রধান শিক্ষকই আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের সন্তানদের জোর পূর্বক গরুর মাংস খাইয়েছিলেন। হিন্দু ধর্মালম্বীর শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানিয়ে তার কাছে গেলে তিনি বলেছিলেন, গরুর মাংস খেলে কিচ্ছু হয় না। এ বিষয়ে পত্রিকায় একাধিক সংবাদও ছাপা হয়েছিলো। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় আমরা এর কোন বিচার পাইনি। এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও কি আমরা তার বিচার পাবো না?

প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানানো ১৭ শিক্ষকের মধ্যে আওয়ামীলীগের আমলে রাজনৈতিক ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক, মহিলা আওয়ামী লীগ ফরিদগঞ্জ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানার স্বাক্ষরও রয়েছে। লিখিত অভিযোগে অনাস্থা জানিয়ে শিক্ষকরা বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, গত প্রায় দুই মাস ধরে অত্র প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক জনাব রফিকুল আমিন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারনে আত্মগোপনে রয়েছেন। তিনি সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকাকলীন উপজেলা আওয়ামীলীগ ও জেলা আওয়ামীলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তাই সরকার পরিবর্তনের পরে বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতা প্রধান শিক্ষকের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়। নিয়মিত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনকালীন সময়েও তিনি নানা কাজে বিতর্কিত ছিলেন। প্রধান শিক্ষকের বিতর্কিত নিয়োগ, শিক্ষা সনদ নিয়ে মিথ্যাচার, ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সন্তান পরিচয়ে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ, একাধিক মাধ্যমিক স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হয়ে স্কুলের রুটিন ওয়ার্ক বাদ দিয়ে সে সব স্কুলে সময় দেয়া সহ নানা বিষয়ে তিনি স্কুলের ‘প্রধান শিক্ষক’ পদটিকে প্রশ্নবিদ্ধ ও হাসির খোরাকে পরিণত করেছিলেন। যার কারনে আমরা শিক্ষকগণ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিলো। এ বিষয়ে স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে অসংখ্য তথ্য নির্ভর সংবাদ গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়েছিলো। সর্বোপরি প্রধান শিক্ষকের অদক্ষতা ও অপারদর্শিতার কারনে আমরা শিক্ষকগণ ৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে বেতন ভাতা পাচ্ছি না। এমতাবস্থায় স্কুলের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার শিক্ষার পরিবেশ বিনির্মান করতে বিতর্কিত পলাতক প্রধান শিক্ষকের অপসারণের দাবী জানিয়ে আমরা স্কুলে কর্মরত শিক্ষকগণ স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে তার বিরুদ্ধে একযোগে অনাস্থা জ্ঞাপন করলাম। ‘

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে পলাতক রয়েছেন প্রধান শিক্ষক। পালানোর আগে তিনি স্কুলের কাউকে লিখিত ভাবে ভারপ্রাপ্ত কোন দায়িত্ব দিয়ে যাননি। যার ফলে গত দুই মাস ধরে টালমাটাল ভাবে চলছে স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম। প্রধান শিক্ষকের দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি ও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা অপকর্ম করায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছে স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। ইতোমধ্যে প্রধান শিক্ষককে স্কুল ক্যাম্পাসে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে স্কুল থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি সরানোর অভিযোগে পদত্যাগ চেয়ে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে তালা দিয়েছিলো বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতা ও অভিভাবকবৃন্দ। এখনও তার কক্ষে তালা ঝুলছে।

এতো ঘটনার পরও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে স্বপদে বহাল তবিয়তে আছেন প্রধান শিক্ষক। বরং প্রধান শিক্ষকের দাবী তিনি পদত্যাগ করবেন না, কাউকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বও দিবেন না। মোবাইল ফোনে দূর থেকে স্কুল চালাবেন। যদিও তার এমন বক্তব্যকে অগঠনমূলক ও বেআইনি বলেছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের কুমিল্লা অঞ্চলের উপ-পরিচালক। অথচ তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়ার এক মাস পরও কোন দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তার দপ্তর থেকেও।

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের যুগ্ম সচিব (সরকারি বিদ্যালয় শাখা) কাজী এমডি আবদুর রহমান, বিপিএএ জানান, এ বিষয়ক অভিযোগ হাতে পেয়েছি। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি৷

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের কুমিল্লা অঞ্চলের উপ-পরিচালক মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে আমি পূর্বেও অবগত হয়েছি৷ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশগত বিষয়ে আপনি যে তথ্য জানালেন পরিস্থিতি এমন হলে আবশ্যই ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে। একটি সরকারি স্কুলের যথাযথ শিক্ষার পরিবেশ ফেরাতে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব কাউকে দেয়া হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন। একটি প্রতিষ্ঠান এভাবে  চলতে পারে না, যথাযথ ভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সার্থে সার্বিক বিবেচনায় নিশ্চয়ই কাউকে দ্বায়িত্ব দেয়া হবে।

অভিযুক্ত রফিকুল আমিন মুঠোফোনে জানান, দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কারনে আমি স্কুলে যাচ্ছি না। কেন যাচ্ছি না তা অনেকেই জানেন। সকল শিক্ষক আমার বিরুদ্ধে অনাস্থা দিয়েছেন তা আমি বিশ্বাস করি না।