ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশনের নতুন উদ্যোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

যাকাতভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, মানবিক উন্নয়ন ও টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশনের ‘জীবিকা চাঁদপুর’ প্রকল্পের ৫ম পর্যায়ের (5th Phase) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। নতুন এই পর্যায়ের উদ্বোধনের মাধ্যমে বেকারত্ব হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ড্যাফোডিল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সোহেল রুশদী। এছাড়া ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন, জীবিকা চাঁদপুর প্রকল্পের কর্মকর্তা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিভিন্ন শ্রেণির-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, “যাকাত দান নয়, এটি অধিকার”—এই দর্শনকে সামনে রেখেই ২০১৫ সালের মার্চ মাসে ‘জীবিকা চাঁদপুর’ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে চাঁদপুর সদর উপজেলার কল্যাণপুর, আশিকাটি, মৈশাদী ও তরপুরচণ্ডী ইউনিয়ন এবং চাঁদপুর পৌরসভার ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ৩ হাজার ৫০০ পরিবারের ১৬ হাজার ৫০০ মানুষ এ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণ করছেন। সুদমুক্ত অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাসহ নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলাই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য।

অনুষ্ঠিতে প্রকল্পের বিভিন্ন সাফল্য তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, মাত্র ৫ কোটি টাকার মূলধন দিয়ে পরিচালিত ঘূর্ণায়মান তহবিলের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ কোটি টাকার অর্থায়ন সম্পন্ন হয়েছে, যার মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ পরিবার টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছে। মোট ৭ হাজার ১২১টি বিনিয়োগের মাধ্যমে ৮০ শতাংশ পরিবার সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছে এবং ৫৬ শতাংশ পরিবার স্থায়ী আয়ের উৎস গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া ৪৭ শতাংশ পরিবার তাদের মাসিক আয় ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকায় উন্নীত করে নিম্ন আয়ের স্তর থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে।

আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রকল্পভুক্ত পরিবারগুলোর মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ ইতোমধ্যে সাড়ে তিন কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে ‘ইউনুস খান প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র’-এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১৯ হাজার ৯৪০ জন রোগীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রায় ৬২ লাখ ৬০ হাজার টাকার ওষুধ প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা সহায়তা হিসেবে ১০৩ জনকে ১৫ লাখ ১৩ হাজার ৭১১ টাকা প্রদান করা হয়েছে।

শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে প্রকল্পটি। এ পর্যন্ত ১৯ হাজার ১৩৮ জন নারী ও কিশোরী জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। ৫৩০ জন শিশুর প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং ৫০৪ জনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া ৩১৯ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা বৃত্তির আওতায় এসেছে, যার মধ্যে বর্তমানে ১২৯ জন শিক্ষার্থী প্রতি মাসে মোট ২ লাখ টাকা বৃত্তি পাচ্ছে। পাশাপাশি ২৬৮ জন শিশুর ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন দেশের বিভিন্ন স্থানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ‘ডিআইএসএস চাইল্ড হোম’, জাতীয় পর্যায়ের স্কলারশিপ কর্মসূচি এবং ‘আরবান শিশু শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রম’ পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তার ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে বলেও অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

নতুন ৫ম পর্যায়ে আরও এক হাজার নতুন পরিবারকে প্রকল্পের আওতায় এনে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন বক্তারা। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার পরিধি আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বক্তারা বলেন, ‘জীবিকা চাঁদপুর’ শুধু একটি আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি নয়; এটি মানুষের আত্মমর্যাদা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং আত্মনির্ভরশীল জীবন গঠনের এক অনন্য উদ্যোগ। ভবিষ্যতে এই প্রকল্পকে দেশের জন্য একটি অনুসরণীয় জাতীয় মডেল হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন কাজ করে যাচ্ছে।