স্টাফ রিপোর্টার:
একসময় মাদকবিরোধী অভিযানে চাঁদপুর জেলায় আলোচনার শীর্ষে থাকত হাজীগঞ্জ থানা পুলিশ। নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পাশাপাশি মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করে প্রশংসা ও স্বীকৃতিও পেয়েছে থানা পুলিশ। মাদক উদ্ধারে জেলার ‘শ্রেষ্ঠ’ হওয়ার ধারাবাহিকতাও ছিল।
কিন্তু সেই চিত্র যেন এখন অনেকটাই বদলে গেছে। গত কয়েক মাস ধরে হাজীগঞ্জে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। অথচ স্থানীয়দের দাবি, মাদকের ব্যবহার কমার পরিবর্তে এলাকায় মাদকসেবীর সংখ্যা বরং বাড়ছে। একদিকে মাদকের উপস্থিতি নিয়ে অভিযোগ, অন্যদিকে পুলিশের অভিযানে উদ্ধার কম-দুইয়ের মধ্যে এই বৈপরীত্যই এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ ৩০ দিনের তথ্য বলছে, এ সময়ে হাজীগঞ্জ থানা পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৭৭ পিস ইয়াবা ও ১৪০ গ্রাম গাঁজা। মাদক সংক্রান্ত ঘটনায় ১৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২০ জনকে।
মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা থাকলেও উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের বিক্রি ও সেবনের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক সেবনের অভিযোগও পাওয়া যায়। কিন্তু সে তুলনায় পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ খুবই কম।
হাজীগঞ্জ থানা পুলিশের অতীতের মাদকবিরোধী অভিযানের চিত্রের সঙ্গে বর্তমান পরিসংখ্যানের তুলনাই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একসময় হাজীগঞ্জ থানা পুলিশ মাদক উদ্ধারে চাঁদপুর জেলার মধ্যে অন্যতম সেরা হিসেবে পরিচিত ছিল। নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পাশাপাশি মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারের কারণে পুলিশের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় প্রশংসিত হয়েছেন।
অথচ সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারাবাহিকতায় যেন ভাটা পড়েছে। গত ৩০ দিনে মাত্র ৭৭ পিস ইয়াবা ও ১৪০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের তথ্য সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠছে-যে হাজীগঞ্জ একসময় বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারে জেলার শীর্ষে থাকত, সেই হাজীগঞ্জে এখন এক মাসে মাদক উদ্ধারের পরিমাণ এত কম কেন?
মাদক কি সত্যিই কমেছে, নাকি মাদক উদ্ধারে পুলিশের অভিযান কমেছে-নাকি মাদক সরবরাহের ধরন ও কৌশল পরিবর্তিত হয়েছে? বড় কারবারিরা কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে যাচ্ছে? এসব প্রশ্নও এখন আলোচনায়।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, গত কয়েক মাসে হাজীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মাদকসেবীর সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ ইয়াবা ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ তাদের। তাদের প্রশ্ন-মাদকসেবীর সংখ্যা যদি বাড়ে, তাহলে মাদক উদ্ধারের পরিমাণ কমছে কেন?
হাজীগঞ্জের মাদক পরিস্থিতি সম্পর্কে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, এ উপজেলায় মাদকের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি। মাদকের বিস্তার রোধে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও নিয়মিতভাবে কাজ করছে এবং বিভিন্ন সময়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
সূত্রটি জানায়, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মাদকের সরবরাহ বন্ধে বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে পুলিশের গত ৩০ দিনের উদ্ধার তথ্য মিলিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। মাদকের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি হলে পুলিশের অভিযানে এক মাসে মাত্র ৭৭ পিস ইয়াবা ও ১৪০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের কারণ কী?
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রির বিষয়ে অনেকেই অবগত থাকলেও মাদকের বড় কারবারি কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা তুলনামূলক কম।
তাদের দাবি, মাদকবিরোধী অভিযান যদি শুধু খুচরা বিক্রেতা, বহনকারী কিংবা সেবনকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে মাদকের মূল সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করা কঠিন। মাদকের উৎস, সরবরাহের পথ, বড় কারবারি এবং এর পেছনের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তবে অতীতের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে থাকলে এর কারণ সম্পর্কে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে হাজীগঞ্জ-ফরিদগঞ্জ সার্কেলের পুলিশ সুপার মুকুল কুমার চাকমা বলেন, আমরা নিয়মিত অভিযান করছি। মাদকবিরোধী সভা করছি। মাদক এখন আর সহজলভ্য না।
অন্যদিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো.লুৎফর রহমান বলেন, আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।
পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর উভয় পক্ষই মাদক নির্মূলে নিয়মিত কাজ করার কথা জানিয়েছে। কিন্তু একসময় যে হাজীগঞ্জ থানা পুলিশ বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের কারণে জেলার মধ্যে ‘শ্রেষ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই হাজীগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে মাদক উদ্ধারের পরিমাণ কেন এতটা কমে গেছে-এ প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের আরেক দাবি, মাদকসেবী কমছে না, বরং বাড়ছে। তাহলে মাদকসেবীদের কাছে মাদক আসছে কোথা থেকে? মাদকের সরবরাহ ব্যবস্থা কি পুলিশের নজর এড়িয়ে চলছে? নাকি বদলে গেছে মাদক ব্যবসার কৌশল? এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছেন হাজীগঞ্জের সচেতন মহল।


