ডিজেলের বাসে সিএনজি!–চাঁদপুরে অনুমোদন ছাড়াচলছেদুই শতাধিক বাস

কাদের পলাশ

ডিজেলে চলার অনুমোদন, অথচ সড়কে চলছে গ্যাসে। চাঁদপুরের বিভিন্ন রুটে এমন বাসের সংখ্যা কয়েকশ। পরিবহন মালিক পক্ষের দাবি, ডিজেলের তুলনায় গ্যাসে খরচ কম। তাই রাতারাতি পরিবর্তন করা হচ্ছে বাসের জ্বালানি ব্যবস্থা। কিন্তু প্রশ্ন হলো কার অনুমতিতে?কীভাবে পরিবর্তন করা হচ্ছে জ্বালানি ব্যবস্থা?আর এসব বাসের নিরাপত্তাই বা কতটা নিশ্চিত? বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানের পর এ প্রতিবেদকের তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল দুপুরে অভিযান চালিয়েছে চাঁদপুর ট্রাফিক পুলিশ। ওয়্যারলেস এলাকা থেকে জব্দ করা হয়েছে তিনটি বাস।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে চাঁদপুরের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী অন্তত ২শ বাসের জ্বালানি ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ব্যবহার করা হচ্ছে সিএনজি।সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন কিংবা কারিগরি যাচাই ছাড়াই বাসে বসানো হচ্ছে গ্যাস ব্যবহারের সরঞ্জাম। আর এরপরই ডিজেলের বাস নামছে গ্যাসে। কীভাবে হচ্ছে এই পরিবর্তন? বিভিন্ন ভাবে খোঁজ নেয়া হয়। এতে দেখা যায়,বাস মালিকরা সুবিধামতো স্থানে পরিবহনগুলোতে সিলেন্ডার স্থাপন করে। কুমিল্লার জাঙ্গালিয়া বাসস্ট্যান্ডেও ভ্রাম্যমান ঝালাই মেস্ত্রী দিয়ে এসব কাজ করানোর প্রমাণ পাওয়ায়। যে স্ট্যান্ডে বেশির ভাগ বোগদার যাত্রী উঠায় এবং নামায়। (ভিডিও সংরক্ষিত) সম্প্রতি এ এলাকাতেই কুমিল্লা-ব ১১-০১৫৩ ও কুমিল্লা-ব-১১০২৩৯বাস দুটিতে সিলেন্ডার স্থাপন করতে দেখা যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে সেখানে শ্রমিক ও মেস্ত্রীদের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

অথচ এসব বাস চলাচলের ক্ষেত্রে বিআরটিএ থেকে ডিজেল মানে তেল দিয়ে চালানো অনুমোদন। কিন্তু বাস্তবে এসব বাস দীর্ঘদিন ধরে চলছে গ্যাস ব্যবহার করে। এরমধ্যে বেশির ভাগ বাস হচ্ছে চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটের বোগদাদ পরিবহন,চাঁদপুর-মতলব-ঢাকা রুটের জৈনপুরি পরিবহন, জৈনপুর এক্সপ্রেস ও মতলব পরিবহন এবং চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর রুটের আনন্দ পরিবহন। অর্থাৎ বিভিন্ন পরিবহনের দুইশতাধিক পরিবহন সরকারের নিয়মনীতি মানছে না। অথচ সরকারি নির্দেশনা রয়েছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ ভারী ও মাঝারি বাণিজ্যিক গাড়ি (বাস, ট্রাক, লরি) ডিজেল চালিত। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বাণিজ্যিক গাড়ি যদি ডিজেল ইঞ্জিন থেকে সিএনজি বা এলপিজি গ্যাসে রূপান্তর করা হয়, তবে বিআরটিএ-এর ব্লু-বুকে বা ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটে জ্বালানির ধরন সংশোধন করা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। অথচ এসবে পাত্তাই দিচ্ছে না বাস মালিকপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাঁদপুর জেলায় ৬টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে এসব পরিবহনগুলো গ্যাস নিয়ে থাকে। এরমধ্যে ছোট বাসগুলো প্রতিবার ২ হাজার ৩ হাজার টাকার ও বড় বাস ৪ হাজার ৬ হাজার টাকার গ্যাস নিয়ে থাকে। শারমিন ফিলিং স্টেশন ম্যানেজার জানান,তাদের সেটশন থেকে প্রতিদিন অন্তত ৩৫- ৪০টি ছোট বাস গ্যাস নিয়ে থাকে।

চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটের আটককৃত বোগদাদ বাস চালক মো.রিপন জানান,আমাদের পরিবহনে শতাধিক বাস রয়েছে। তার মধ্যে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটের বেশ কিছু বাস দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসে চলছে। কিন্তু কিভাবে হয়েছে সেটা মালিক পক্ষই বলতে পারবে।
চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর রুটের আনন্দ পরিবহনের বাস চালক মো.মনির হোসেন জানান, চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর রুটে ৪০টি বাস চলাচল করে। তার মধ্যে অধিকাংশই গ্যাসে চলে। কারণ তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে তারা যাত্রী সেবা দিয়ে লাভ করতে পারছেননা। তবে গ্যাসে চলার কারণে মালিক শ্রমিক সবাই লাভবান হচ্ছেন।

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন সংগঠনের চাঁদপুর এর সভাপতি এম এ লতিফ বলেন, অনুমোদিত পদ্ধতি ছাড়া গাড়ির জ্বালানি ব্যবস্থা পরিবর্তন নীতিবহির্ভূত। এর প্রভাব পড়তে পারে যাত্রী নিরাপত্তায়। এক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর জরুরি পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
চাঁদপুরে বিভিন্ন পরিবহনের অন্তত ৩শ বাস চলাচল করে। যদিও কতটি গাড়ি সিএনজিতে রূপান্তর হয়েছে এমন তথ্য দিতে পারেননি চাঁদপুর বাস মালিক সমিতির সভাপতি ফেরদৌস আলম বাবু। তিনি বলেন, এগুলো দেখা আমাদের দায়িত্ব না। মালিক পক্ষ তাদের সুবিধা মতো ওসব করছেন।

চাঁদপুর ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা (টিআই এডমিন) প্রবীর দাস বলেন, এমন তথ্য আমাদের কাছে আগে ছিল না। বিষয়টি জানার পরপরই আমরা উর্ধ্বতন কর্তপক্ষের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছি।শহরের ওয়ারলেস এলাকায় অভিযান চালিয়ে চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটের বোগদাদ পরিবহনের একটি বাস এবং চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর রুটের আনন্দ পরিবহনের একটি বাস জব্দ করা হয়। এছাড়া শহরের বাবুরহাট শারমিন ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেয়ার সময় অভিযান চালিয়ে চাঁদপুর-মতলব-ঢাকা রুটের জৈনপুরি পরিবহনের একটি বাস জব্দ করা হয়। পরে এসব বাস চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে পুলিশ লাইনে প্রেরণ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে চাঁদপুরেরঅতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাদিরা নুর বলেন,আমরা রুট পরমিট বিহীন গাড়ি চলাচলে নিয়মিত অভিযান করি। জ্বালানী ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।

এ বিষয়ে বিআরটিএর চাঁদপুরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, যেসব রুটের বাস তেলের অনুমতি নিয়ে এখন গ্যাস ব্যবহার করছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। তবে এসব বাসের রুট পারমিট হয়েছে ঢাকা, নোয়াখালী ও কুুমিল্লা থেকে। তবে যেহেতু চাঁদপুরে এসব বাস চলাচল করছে এ বিষয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ পেলে আমরা ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।