চাঁদপুরে মৎস্য সম্পদের ক্ষতি প্রায় ১৭ কোটি

বিল্লাল ঢালী:
চাঁদপুরের অতি বৃষ্টি ও বন্যার প্রভাবে মৎস্য সম্পদের ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৭ কোটি টাকা। অতি বৃষ্টির প্রভাবে জেলার সবকটি উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে মৎস্য সম্পদের। অতিবৃষ্টি ও বন্যার প্রভাবে পুকুর দিঘী ও ঘেরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। এতে নিঃস্ব হওয়ার পথে অনেক মৎস্য চাষী। কোটি কোটি টাকা লগ্নি করে এখন তারা দিশেহারা। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে অনেকে নেট জাল দিয়ে বেড়া দিয়ে মাছ পুকুর দিঘী ঘেরে রাখার চেষ্টা করলেও লাভ হয়নি তাতে ‌। পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে পানির সাথে ভেসে গেছে তাদের চাষকৃত প্রায় ৮০ ভাগ মাছ। মৎস্য চাষিরা ব্যবসায়িকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে এখন তারা সরকারি সাহায্য প্রার্থনা করছেন। জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নের সংখ্যা ৬২ টি। ক্ষতিগ্রস্ত কুকুর দিঘী খামারের সংখ্যা ১০ হাজার ৮শ ১টি। ক্ষতিগ্রস্ত ঘেরের সংখ্যা ৫৫ টি। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর দিকের আয়তন ১৯৫৬ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত ঘেরের আয়তন ৪শ ৮ হেক্টর। মাছ উৎপাদনে ক্ষতি হয়েছে ৬৮৩২ মেট্রিক টন। অন্যান্য মাছের মধ্যে রয়েছে চিংড়ি মাছ ১ মেট্রিক টন। মাছের পোনা ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি ৩৯ লক্ষ। মাছের আনুমানিক মূল্য ১৫ কোটি ৫৯ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। মাছের পোনার মূল্য ৯ কোটি টাকা।

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী জেলার ৮টি উপজেলা কমবেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ক্ষয় ক্ষতির মধ্যে রয়েছে মতলব উত্তরে ৩টি, ফরিদগঞ্জে ৮টি, চাঁদপুর সদরে ৬টি, কচুয়ায় ১২টি, হাজীগঞ্জে ১২টি, মাতব দক্ষিনে ৭টি, শাহরাস্তিতে ১০টি ও হাইমচর উপজেলায় ৪টি ইউনিয়ন।

উপজেলা ভিত্তিক হিসেবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, মতলব উত্তর উপজেলায় ৩টি ইউনিয়নে। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর, দিঘী ও খামারের সংখ্যা ৩টি। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর ও দিঘির আয়তন ৮ দশমিক ৪০ হেক্টর। মাছের ক্ষতি হয়েছে ৪৫ মেট্রিক টন। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৯০ লক্ষ টাকা। এই উপজেলায় অবকাঠামগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ২০ লক্ষ টাকা। উপজেলাটিতে মোট ক্ষতি পরিমান দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা।

ফরিদগঞ্জ উপজেলায় মাছের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৮টি ইউনিয়নে। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর, দিঘী ও খামারের সংখ্যা ১২৫০টি। এই উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫টি মাছের ঘের। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর ও দিঘির আয়তন ২৭৫ হেক্টর ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘেরের আয়তন ৪শ হেক্টর। মাছের ক্ষতি হয়েছে ৪শ মেট্রিক টন। মাছের পোনা ক্ষতি হয়েছে ৪০ লক্ষ। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৬ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। এই উপজেলায় অবকাঠামগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি টাকা। উপজেলাটিতে মোট ক্ষতি পরিমান দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা।

চাঁদপুর সদর উপজেলায় মাছের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৬টি ইউনিয়নে। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর, দিঘী ও খামারের সংখ্যা ৪৫০টি। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর ও দিঘির আয়তন ৮৯ হেক্টর। মাছ উৎপাদনে ক্ষতি হয়েছে ৮০ মেট্রিক টন। মাছের পোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ কোটি ।যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৫ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা। এই উপজেলায় অবকাঠামগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ২০ লক্ষ টাকা। উপজেলাটিতে মোট ক্ষতি পরিমান দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা।

কচুয়া উপজেলায় মাছের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ১২টি ইউনিয়নে। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর, দিঘী ও খামারের সংখ্যা ৭২টি। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর ও দিঘির আয়তন ১৭ হেক্টর। মাছ উৎপাদনে ক্ষতি হয়েছে ১২ মেট্রিক টন। মাছের পোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লক্ষ ৫০ হাজার। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ২২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। এই উপজেলায় অবকাঠামগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। উপজেলাটিতে মোট ক্ষতি পরিমান দাঁড়িয়েছে ২৭ লক্ষ টাকা।

হাজিগঞ্জ উপজেলায় মাছের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ১২টি ইউনিয়নে। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর, দিঘী ও খামারের সংখ্যা ২৩৭৪টি। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর ও দিঘির আয়তন ৪৭৯ দশমিক ৭৫ হেক্টর। মাছ উৎপাদনের ক্ষতি হয়েছে ৭১৯ দশমিক ৬৩ মেট্রিক টন। মাছের পোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১১ লক্ষ্য। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ১ কোটি ৮০ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা। এই উপজেলায় অবকাঠামগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ২০ লক্ষ টাকা। উপজেলাটিতে মোট ক্ষতি পরিমান দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ২০ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা।

মতলব দক্ষিণ উপজেলায় মাছের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৭টি ইউনিয়নে। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর, দিঘী ও খামারের সংখ্যা ১২০টি। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর ও দিঘির আয়তন ২৪ দশমিক ২৯ হেক্টর। মাছ উৎপাদনের ক্ষতি হয়েছে ১০ মেট্রিক টন। মাছের পোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ লক্ষ্য। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ২৫ লক্ষ  টাকা। এই উপজেলায় অবকাঠামগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ১০ লক্ষ টাকা। উপজেলাটিতে মোট ক্ষতি পরিমান দাঁড়িয়েছে ৩৫ লক্ষ টাকা।

শাহারাস্তি উপজেলায় মাছের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ১০টি ইউনিয়নে। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর, দিঘী ও খামারের সংখ্যা ৬ হাজার ৫শ টি। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর ও দিঘির আয়তন ১৪৫২হেক্টর। মাছ উৎপাদনের ক্ষতি হয়েছে ৫ হাজার ৫শ মেট্রিক টন। এছাড়াও চিংড়ি মাছের ক্ষতি হয়েছে এক মেট্রিক টন।এই উপজেলায় মাছের ঘের  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০ টি। এর আয়তন ৮ হেক্টর। মাছের পোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮০ লক্ষ্য। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৪ কোটি ৬৩ লক্ষ ৫০ হাজার  টাকা। এই উপজেলায় অবকাঠামগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ২০ লক্ষ টাকা। অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতিসহ উপজেলাটিতে মোট ক্ষতি পরিমান দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ৯৭ লক্ষ টাকা।

এবং হাইমচর উপজেলায় মাছের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৪টি ইউনিয়নে। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর, দিঘী ও খামারের সংখ্যা ৩২টি। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর ও দিঘির আয়তন ১০ দশমিক ৫২ হেক্টর। মাছ উৎপাদনের ক্ষতি হয়েছে ৬৫ মেট্রিক টন। মাছের পোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লক্ষ্য ৩০ হাজার। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৩৫ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা। উপজেলাটিতে মোট ক্ষতি পরিমান দাঁড়িয়েছে ৩৫ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা।

অতিবৃষ্টি ও বন্যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য চাষীদের বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা গোলাম মেহেদী হাসান বলেন, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদের তালিকা করেছি। এবং তা মন্ত্রণালয় পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় থেকে যদি চাষীদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয় তখন আমরা তালিকা অনুযায়ী তাদের দেওয়ার ব্যবস্থা করব। এছাড়াও মৎস্য চাষিরা যদি ব্যাংক লোনে সহযোগিতা চায় তবে মৎস্য অফিস থেকে তা করা হবে।