ইরানের মতো জ্ঞান–বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি করতে হলে বাংলাদেশের করণীয়

ভূমিকা
২১শ শতাব্দী হলো জ্ঞান ও প্রযুক্তির শতাব্দী। যে রাষ্ট্র জ্ঞান–বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি করতে সক্ষম, সেই রাষ্ট্রই অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, কূটনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে নেতৃত্ব দিতে পারে। মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশ আজও প্রযুক্তিনির্ভরতায় পিছিয়ে থাকলেও ইরান এক অনন্য ব্যতিক্রম। দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও দেশটি শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আত্মনির্ভর উন্নয়নের এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ যদি টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে চায়, তবে ইরানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া অপরিহার্য।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং “ডিজিটাল বাংলাদেশ” কর্মসূচি এর উদাহরণ। তবে এখনো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মুখস্থনির্ভর, গবেষণার বাজেট অপ্রতুল, এবং দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে আমরা পিছিয়ে। শ্রমঘন শিল্প ও প্রবাসী আয়নির্ভর অর্থনীতি আমাদের দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে পারবে না। তাই এখন প্রয়োজন গবেষণানির্ভর, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া।
বাংলাদেশের করণীয়
১. শিক্ষা সংস্কার
গবেষণানির্ভর শিক্ষা চালু করতে হবে, যেখানে সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনকে মুখ্য ধরা হবে।
প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) শিক্ষার মান বাড়াতে হবে।
কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে।
২. গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ
জাতীয় বাজেটে গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্পখাত সহযোগিতা (University–Industry Collaboration) বাড়াতে হবে।
বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে—যেমন ন্যানোটেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ গবেষণা।
৩. আত্মনির্ভর প্রযুক্তি নীতি
আমদানি–নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় প্রযুক্তি বিকাশে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
“Made in Bangladesh” উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে স্থানীয় প্রযুক্তিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
৪. তরুণ উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন
স্টার্টআপ-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেশন হাব ও উদ্যোক্তা ইনকিউবেটর স্থাপন জরুরি।
তরুণ গবেষকদের জন্য বিশেষ Innovation Fund গঠন করতে হবে।
৫. প্রতিরক্ষা ও সাইবার প্রযুক্তি বিকাশ
জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় দেশীয় সাইবার প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
নিজস্ব ড্রোন, স্যাটেলাইট ও AI-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়ন করতে হবে।
৬. সঙ্কটকে সুযোগে রূপান্তর
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটকে ভয় না পেয়ে আত্মনির্ভর গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগে রূপান্তর করতে হবে।
কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৭. ইসলাম ও বিজ্ঞানের সমন্বয়
ইসলাম জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করে—তরুণ প্রজন্মকে বুঝাতে হবে যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইসলামের বিরোধী নয় বরং ইসলামী ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা।
ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রেখেও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি সম্ভব, যেমন ইরান দেখিয়েছে।
৮. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
দক্ষিণ এশিয়া, মুসলিম বিশ্ব ও উন্নত দেশগুলোর সাথে যৌথ গবেষণা বাড়াতে হবে।
প্রযুক্তি ট্রান্সফার, একাডেমিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম ও গবেষণা নেটওয়ার্ক জোরদার করতে হবে।

উপসংহার
বাংলাদেশ যদি ইরানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষা সংস্কার, গবেষণায় বিনিয়োগ, আত্মনির্ভর প্রযুক্তি নীতি ও তরুণ উদ্ভাবকদের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে জ্ঞান–বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি অর্জন সম্ভব। ইরান প্রমাণ করেছে—সংকট যতই কঠিন হোক, আত্মনির্ভরতা, কৌশলগত পরিকল্পনা ও দৃঢ় নেতৃত্ব থাকলে মুসলিম বিশ্বও প্রযুক্তির শীর্ষে পৌঁছাতে পারে। তাই সময় এসেছে বাংলাদেশকেও শ্রমঘন অর্থনীতি থেকে সরে গিয়ে জ্ঞান–প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার।

প্রবন্ধকার : মো. মোবারক করিম খান
প্রভাষক: আইসিটি ফরিদগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজ।