মনিরুজ্জামান বাবলু
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ২ টা। ঘুমিয়ে পড়ল গেনু চাচা।
ঘুমেরঘোরে গেনু চাচা আড়াল থেকে রিমির চিৎকার শুনতে পেল। গেনু চাচার প্রচন্ড হাসি আসছে। কিন্তু হাসলেই বিপদ। রিমির চিৎকারের সাথে সাথে সামনে গেলেও বিপদ।
রিমি চিৎকার দিতে দিতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে পড়লো। এদিকে রিমির মা-বাবা ও বাড়ির দারোয়ান তড়িঘড়ি করে ঘুম থেকে উঠে সামনে এলো। তারপর এলো গেনু চাচা। ধরাধরি করে রিমিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার বাবা ও গেনু চাচা।
রিমিরা বিহারী। মিরপুরের বিহারী পল্লীতে দোতলা বাড়ি। গেনু চাচা তাদের পরিবারের একজন নকরি। তাদের পরিবারের এক বিশ্বস্ত লোক। খেটেখুটে খায়-দায়। দেশ ভাগ নিয়ে যুদ্ধ চলছে। তা নিয়ে গেনু চাচার ভ্রুক্ষেপ নেই। গ্রামের বাড়ির খোঁজ-খবরও নেয়া হয় না। কাজকে বেশি পছন্দ করেন। রিমির মা বাজারের তালিকা দিলে গেনু চাচা স্বচ্ছভাবে হিসেব দিতে পারে।
রিমিকে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হলো। গাইনী বিশেষজ্ঞ ও সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকেরা অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করলো। চিকিৎসকরা অপারেশন সাকসেস করে জানালো- রিমির শরীর থেকে একটি সুই ও কয়েক টুকরা বেগুন বের করা হলো।
চিকিৎসকরা বললেন রিমিকে দুইদিন হাসপাতলে বিশ্রাম নিতে হবে। রিমির পাশে দুই দিন দেখাশুনার দায়িত্ব পড়লো গেনু চাচার। বেচারার হাসি আসছে। কিন্তু প্রকাশ্যে হাসলে যে বিপদ। রিমি যে ঘটনার শিকার হলো, তাতে ষোলআনাই দোষী গেনু চাচা। ঘটনা ফাঁস হলে নিস্তার নাই। নকরি তো যাবেই, প্রাণ বাঁচানো দায় হয়ে যাবে।
রিমির বাবা- মা বাড়ীর দারোয়ান বজলু মিয়াকে ডেকে আনলো। তুমি আমার মেয়ের এই সর্বনাশ করেছ কেন? বেধড়ক মারধর খেয়ে বজলু মিয়া হতবাক। কোন কিছু বুঝতে পারছে না। দোষী না হয়েও অপবাদ। তার ওপর প্রহার। শরীর জুড়াবে নাকি মনকে বুঝাবে বজলু মিয়া। কাউকে বিশ্বাস করাতে পারছে না। রিমির এমন পরিস্থিতির সাথে বজলু মিয়া জড়িত নন।
হাসপাতালে বসেই গেনু চাচা খবর পেলো বাড়ির দারোয়ানকে মারধর করা হয়েছে। মনে মনে বলছে, আহ্! বজলু মিয়ার তো কোন দোষ নেই। আমি ভুল করেছি। এমন হবে আগে জানতাম না।
রিমি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরল। রিমিও এবার চড়াও হলো বজলু মিয়ার ওপর। বজলু মিয়াে ডেকে এনে থাপ্পর মারলো। বজলু মিয়ার এই বাসায় আর ঠাঁই নাই। দেশে অস্থিরতা চলছে। পাক-বাহিনীর হামলা। চারদিকে গোলাবারুদের আওয়াজ। বজলু মিয়ার আর চাকরী-বাকরী হবেও বা কোথায়! মিথ্যা অপবাদ নিয়ে ছাড়তে হলো বিহারী পল্লী।
গেনু চাচা যত হাসতে চায়, ততই নিজের প্রতি অনুশোচনা তৈরি হয়। রিমির পরিবার গেনু চাচার প্রতি বিশ্বাসের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিলো। কিন্তু সময়ের স্রোতে গেনু চাচার ভিতরে ভয় যে বেড়ে চলছে। মুখ ফসকে যদি কখনও হাসি আসে। তাহলে তো জবাব দিতে হবে? কেন হাসলাম।
কয়েকদিন পর রিমি আবার গেনু চাচাকে ডেকে বলল- চাচা, আমার জন্য আদা কেজি বেগুন আনবেন। গেনু চাচা এবারও কোনোমতে হাসিটাকে আটকে রাখলেন। মনে পড়ে গেল, ওই রাতে বাথরুমে রিমির রাখা বেগুন ব্লেড দিয়ে কেটে কেটে সুঁই গেঁথে রেখেছিল। তারপর যা ঘটে গেল- গেনু চাচা হাসলে বিপদ ছিল।
দেশ স্বাধীন হবার খবর শুনে স্বস্তিবোধ করলো গেনু চাচা। গ্রামের বাড়িতে যাবার একটা সুযোগ হলো। কতমাস হয়ে গেল গ্রামের বাড়ির খোঁজ-খবর নেয়া হয় না। রিমির মা-বাবার কাছে ছুটি নিলো। গ্রামের বাড়ীতে গিয়ে আর সেই বিহারী পল্লীতে ফেরা হয়নি গেনু চাচার।
হঠাৎ গেনু চাচার ঘুম ভেঙ্গে গেল।


