স্টাফ রির্পোটার:
বাবাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে হারানোর সাত বছর পর এবার নির্মম হত্যাকাণ্ডে মা ও তিন বোনকেও হারিয়েছেন ১৮ বছর বয়সী জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে সংঘটিত এ ঘটনায় স্বজনহারা সিফাতের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
বাবার মৃত্যুর পর মা ও তিন বোনকে নিয়ে কোনো রকমে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন ১৮ বছর বয়সী জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। কিন্তু সেই সংগ্রামী পরিবারটিই এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দেনায়েতপুর এলাকায় এক ঘাতকের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন সিফাতের মা শাহিনুর বেগম (৩৮), বড় বোন সায়মা আক্তার (২১), মেজো বোন ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট বোন শিফা আক্তার (৯)।
২০১৯ সালে সিফাতের বাবা মো. কামাল হোসেন হকারি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর থেকে মা শাহিনুর বেগম সন্তানদের নিয়ে রায়পুরের ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন। সংসারের হাল ধরতে রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি শিক্ষার্থী সিফাত কয়েক মাস আগে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। মাসে ৮ হাজার টাকা বেতনে কাজ করে পড়ালেখার পাশাপাশি পরিবার চালাতে সহায়তা করছিলেন তিনি।
কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে কাজে বের হওয়ার পরই ঘটে মর্মান্তিক এ হত্যাকাণ্ড। অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (২৮) ধারালো অস্ত্র দিয়ে সিফাতের মা ও তিন বোনকে কুপিয়ে হত্যা করে। পরে স্থানীয় জনতার গণপিটুনিতে অভিযুক্ত অন্তরেরও মৃত্যু হয়।
সিফাতের বন্ধু ওমর ফারুক রনি বলেন, “সিফাতদের ভাই-বোন সবাই খুব মেধাবী ছিল। বাবা অনেক কষ্ট করে সন্তানদের পড়ালেখা করিয়েছেন। সেই পরিবারটি আজ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেল।”
স্বজন হারানোর শোকে ভেঙে পড়া সিফাত কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার মা ও বোনদের কী অপরাধ ছিল? কেন তাদের এভাবে হত্যা করা হলো? আমি এখন কাদের নিয়ে বেঁচে থাকব? পৃথিবীতে আমার আর কেউ রইল না।”
রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, সিফাত তাদের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করছিলেন। এমন মর্মান্তিক ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ঘটনার পর লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার আগে প্রায় দেড় বছর একই এলাকায় ভাড়া থাকতেন এবং সাত-আট মাস আগে বাসা ছেড়ে চলে যান। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্বপরিচয়ের সূত্রে তিনি ওই বাসায় প্রবেশ করেন। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
প্রতিবেশী রাণী জানান, অন্তরকে বাসায় দেখে সন্দেহ হওয়ায় তিনি কলাপসিবল গেট আটকে দিয়ে স্থানীয়দের খবর দেন। তার এ পদক্ষেপের কারণেই ঘটনাটি দ্রুত প্রকাশ্যে আসে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটনে পুলিশ তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। পুরো ঘটনায় রায়পুরসহ আশপাশের এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।


