স্টাফ রিপোর্টার:
একসময় গ্রামবাংলার খাল-বিল, নদী-নালা আর জলাশয়ে মাছ শিকারের অন্যতম পরিচিত উপকরণ ছিল টেঁটা। বর্ষার পানিতে কোমরসমান জল ঠেলে কিংবা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে টেঁটা হাতে মাছ শিকারের দৃশ্য ছিল চিরচেনা। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন, কমেছে টেঁটার ব্যবহার। তবে হারিয়ে যেতে বসা সেই লোকজ পেশাটিই আঁকড়ে ধরে ৪৫ বছর ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার নারায়ণপুরের আব্দুল মালেক।আব্দুল মালেক (৬০)। পিতা মৃত আবিদ আলী। বাড়ি আদরা, নারায়ণপুর, মতলব দক্ষিণ, চাঁদপুর। বয়সের ভার পড়েছে শরীরে, কিন্তু হাতের কাজ থামেনি। নারায়ণপুর বাজারে সপ্তাহে দুই দিন রোববার ও বৃহস্পতিবার হাট বসলে নিজের তৈরি টেঁটা নিয়ে বসেন তিনি। ক্রেতা এলেই মনোযোগ দিয়ে দেখান তৈরি করা উপকরণ। কখনো নতুন করে বানানোর অর্ডারও পান।প্রায় ৪৫ বছর ধরে টেঁটা তৈরির সঙ্গে যুক্ত আব্দুল মালেক। তার কাছে এটি শুধু একটি পেশা নয়, জীবনের দীর্ঘ সময়ের সঙ্গী। লোহার বা স্টিলের শিক দিয়ে তৈরি করা হয় টেঁটার মূল অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় কাঠের হাতল। মাছ শিকারের পাশাপাশি কোথাও কোথাও জলজ প্রাণী ধরার কাজেও এটি ব্যবহার করেন স্থানীয়রা। আকার ও মানভেদে হাতলসহ একটি টেঁটা বিক্রি হয় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়।
আব্দুল মালেকের মতোই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত সোলেমান সওদাগর (৪৫)। পিতা আব্দুস সোবহান সওদাগর। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে টেঁটা তৈরির কাজ করছেন। লোহা কিংবা স্টিলের শিককে নির্দিষ্ট আকৃতি দিয়ে তৈরি করেন মাছ শিকারের এই উপকরণ।তবে আগের দিনের সঙ্গে এখনকার সময়ের পার্থক্য অনেক। আগে গ্রামাঞ্চলে টেঁটার চাহিদা ছিল বেশি। বর্ষা এলেই অনেকেই মাছ শিকারের জন্য টেঁটা কিনতেন। খাল-বিল, ডোবা কিংবা নদীর পাড়ে টেঁটা হাতে মাছ শিকারে বেরিয়ে পড়তেন গ্রামের মানুষ।এখন জলাশয় কমেছে, বদলেছে মাছ ধরার পদ্ধতি। বাজারে এসেছে নানা ধরনের আধুনিক মাছ ধরার সরঞ্জাম। ফলেটেঁটার ব্যবহারও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। তবুও হাটের দিনে কিছু মানুষ এখনো খোঁজ করেন এই ঐতিহ্যবাহী উপকরণের।নারায়ণপুর বাজারের হাটে তাই টেঁটার দোকান শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি গ্রামীণ জীবনের একটি পুরোনো অধ্যায়েরও স্মারক। আব্দুল মালেকের মতো কারিগররা নিজেদের শ্রম আর দক্ষতায় ধরে রেখেছেন সেই ঐতিহ্য।কালের পরিবর্তনে হয়তো একদিন টেঁটার ব্যবহার আরও কমে যাবে। কিন্তু আব্দুল মালেকের হাতের তৈরি টেঁটা মনে করিয়ে দেয়গ্রামবাংলার জীবন ও জীবিকার সঙ্গে কত গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল স্থানীয় কারিগরি আর লোকজ সংস্কৃতি।৪৫ বছর ধরে টেঁটা বানিয়ে চলা আব্দুল মালেকের গল্প তাই শুধু একজন কারিগরের গল্প নয়; এটি গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক লোকজ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প।


