স্টাফ রিপোর্টার
সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন ২০১২ সালে, ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী হিসেবে। চাকরির বয়স এক যুগের কিছু বেশি। এই সময়ের ব্যবধানে চাঁদপুর জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফরিদগঞ্জের সরখাল গ্রামে নির্মাণ করেছেন দৃষ্টিনন্দন দুইতলা বাড়ি। বাড়ির আশপাশে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ও বড় একটি মাছের দীঘি। স্থানীয়দের দাবি, এসব স্থাবর সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা। যদিও দীঘি ও চান্দ্রা বাজারের একটি তার নামে থাকা দোকান জুলাই বিপ্লবের পর সুযোগ বুঝে হাতবদল করেন।
সরকারি চাকরির বেতন-ভাতা ও বৈধ আয়ের সঙ্গে এই সম্পদের সামঞ্জস্য কতটুকু-তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়, সরকারি প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাববলয় তৈরি এবং বিভিন্ন সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় নাছির উদ্দিনের পারিবারিক আর্থিক অবস্থা ছিল সাধারণ। ২০১২ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে তার জীবনযাপন ও আর্থিক অবস্থার চিত্র। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে জমি-জমা ও অন্যান্য সম্পদ।
ফরিদগঞ্জ উপজেলার সরখাল গ্রামে তার নির্মিত দুইতলা বাড়িটি এখন স্থানীয়দের আলোচনার অন্যতম বিষয়। বাড়ির সঙ্গে রয়েছে জমি এবং বড় একটি মাছের দীঘি। স্থানীয়দের দাবি, শুধু দৃশ্যমান স্থাবর সম্পদ হিসাব করলেও বর্তমান বাজারদরে এর মূল্য কয়েক কোটি টাকা। সব মিলিয়ে নাছির উদ্দিনের নামে ও তার নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা হতে পারে বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে-একজন ১৬তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারী চাকরিতে যোগদানের এক যুগের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন?
নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে জেলা পরিষদের রাজস্ব আদায় ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার কর্মকাণ্ডকে ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, জেলা পরিষদের আওতাধীন বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও স্থাপনা থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করতেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রে রসিদ ছাড়াই অর্থ নেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বিভিন্ন খাত দেখিয়ে মাসে মাসে টাকা আদায়ের একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, আদায় করা অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ-বাটোয়ারা হলেও একটি বড় অংশ নিজের কাছে রাখতেন নাছির উদ্দিন। আর এভাবেই সরকারি দায়িত্বের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন-এমন অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বাবুরহাটের ব্যবসায়ী কবির মিজি বলেন, প্রত্যেক বছর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে রসিদ ছাড়াই ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিতেন সার্ভেয়ার নাছির। টাকা না দিলে লিজ বাতিলসহ নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখাতেন।
সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে নাছির উদ্দিন এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। সরকারি পদ ও রাজনৈতিক-প্রশাসনিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে তার বিরুদ্ধে কেউ সহজে কথা বলতে চাইতেন না-এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।
সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলা পরিষদ থেকে একটি রাস্তার বরাদ্দ নিয়ে সেই রাস্তার নামফলকে নিজের নাম লিখে দিয়েছেন এই নাছির।
নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের নামে থাকা বাড়ি, জমিসহ বিভিন্ন সম্পদের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে, কখন কোন সম্পদ কেনা হয়েছে, সম্পদ অর্জনে অর্থের উৎস কী ছিল এবং তার সরকারি চাকরির বৈধ আয় ও বর্তমান সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য কতটুকু—এসব প্রশ্নের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে তার বিরুদ্ধে করা একটি অভিযোগ তদন্তের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে চাঁদপুর জেলা পরিষদের তৎকালীন নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠানো হয়। অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।
জানা যায়, ফরিদগঞ্জের দলমগর মৌজার ৫৪৫, ১৩৯৮, ৬৮০, ৬৩৬, ৬৮০ ও ১৩৬৯ দাগে ৫৫ শতাংশ ১৮ পয়েন্ট জায়গায় তিনি করেছেন। এছাড়াও তার বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একজন ১৬তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারী। চাকরির বয়স এক যুগের কিছু বেশি। এরই মধ্যে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ, সরকারি প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এবং সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রশ্ন।
এ বিষয়ে চাঁদপুর জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা কবির হোসেন সরদার বলেন, আমরা তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেব।


