অটো চালিয়ে শিক্ষা ও জীবিকাচলে নাজিমের

স্টাফ রিপোর্টার

কলেজ ছুটি হওয়ার পর যখন সহপাঠীরা বাড়ির পথে, তখন অটোরিকশার স্টিয়ারিং হাতে নেন নাজিম প্রধান (১৮)। শুরু হয় যাত্রী নিয়ে ছুটে চলা। একটানা অটোরিকশা চালান রাত ১০টা পর্যন্ত। বাড়ি ফিরে বিশ্রামের বদলে আবার বই-খাতা নিয়ে বসেন পড়ার টেবিলে। শুক্রবার ও শনিবার কলেজ বন্ধ থাকায় সকাল থেকেই অটোরিকশা নিয়ে বের হন তিনি। এভাবেই পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বও সামলে চলেছেন এই কলেজছাত্র।

নাজিমের উপার্জনের টাকাতেই চলে তার নিজের পড়াশোনা, পরিবারের খরচ এবং অটোরিকশা কেনার ঋণের কিস্তি। প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করেন তিনি। এর মধ্যে প্রতি মাসে ঋণের কিস্তি বাবদ দিতে হয় ৩ হাজার টাকা।

নাজিমের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার উত্তর দিঘলদী গ্রামে। তার বাবা ওসমান গণি ও মা কুলসুমা বেগম। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে নাজিম চতুর্থ। মা-বাবা দুজনই বৃদ্ধ ও অসুস্থ। পরিবারের কোনো পৈতৃক জমিজমা নেই।

গত বছর বোয়ালিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৩ পেয়ে এসএসসি পাস করেন নাজিম। এরপর মতলব সরকারি কলেজের ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা (বিএম) শাখায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতিতে স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এক বছর আগে অটোরিকশা কেনেন তিনি।
এরপর থেকেই অটোরিকশাটি হয়ে ওঠে তার আয়ের প্রধান অবলম্বন। কলেজ খোলা থাকলে দুপুর পর্যন্ত ক্লাস করেন নাজিম। ক্লাস শেষে অটোরিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন সড়কে ঘুরে ঘুরে রাত পর্যন্ত চালান গাড়ি। বাড়ি ফিরে আবার পড়াশোনায় বসেন। ছুটির দিনে কাজের সময় আরও বেড়ে যায়। সকাল থেকেই শুরু হয় অটোরিকশা চালানো।

নাজিমের বড় ভাই নাজমুল হোসেন বিবাহিত। দিনমজুরি করে যে আয় করেন, তা দিয়ে নিজের সংসার চালাতেই কষ্ট হয় তার। তিন বোনের মধ্যে দুজনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন মানসিকভাবে অসুস্থ। ফলে ছোট বোন ও মা-বাবার ভরণপোষণসহ পরিবারের নানা খরচের বড় একটি অংশ এখন নাজিমের ওপর।

নিজের পড়াশোনার খরচও তাকেই জোগাতে হয়। তাই কাজের চাপ থাকলেও পড়াশোনা ছাড়ার কথা ভাবেননি নাজিম। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ভালো একটি চাকরি করার স্বপ্ন তার। নিজের ও পরিবারের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চান তিনি।

নাজিম বলেন, ‘অটো নিয়া হারা জীবন পইড়া থায়ুম না, লেখাপড়াটা চালামু। উচ্চশিক্ষিত হমু। ভালো একটা চাকরি নিমু। সংসারের অভাব ভালোভাবে ঘুচামু। বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফুটামু।’

নাজিমের এই লড়াইয়ের কথা জানেন তার কলেজের শিক্ষকেরাও। মতলব সরকারি কলেজের বিএম শাখার এক প্রভাষক বলেন, ‘আমি ওই শিক্ষার্থীকে ভালোভাবে চিনি। সে নিয়মিত ক্লাসে আসে। খুবই বিনয়ী। অটোরিকশা চালিয়ে যেভাবে নিজের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাচ্ছে, তা তার অদম্য মানসিকতার প্রকাশ।’

নাজিমের সংগ্রামের কথা শুনে তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম ইশমাম।

একদিকে পরিবারের দায়িত্ব, অন্যদিকে নিজের পড়াশোনা-দুটিই একসঙ্গে সামলাচ্ছেন নাজিম। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কলেজ, এরপর রাত পর্যন্ত অটোরিকশা আর দিনের শেষে বই-খাতা। ক্লান্তির মধ্যেও থামতে চান না তিনি। কারণ তার কাছে অটোরিকশার স্টিয়ারিং শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়, ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন পূরণের পথও।