স্টাফ রিপোর্টার
অসহায়ত্ব আর দারিদ্র্যের সঙ্গে দীর্ঘদিনের লড়াই। দৃষ্টিহীন চোখে পৃথিবীর আলো দেখতে না পেলেও বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকা। নিজের কষ্টের চেয়েও চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা—এভাবেই দিন কাটছিল চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার দক্ষিণ শাসনপাড়া গ্রামের অসহায় নারী ফুলবানু বেগমের। অবশেষে তাঁর দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কিছুটা দূর করতে এগিয়ে এসেছেন জীবন চৌধুরী ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফয়সাল চৌধুরী জীবন।
তাঁর উদ্যোগে ফুলবানু বেগমের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে একটি বসতঘর। দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে বসবাস করা এই দৃষ্টিহীন নারীর কাছে নতুন ঘরটি যেন নিরাপদে বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন, স্বস্তিতে ঘুমানোর নিশ্চয়তা এবং মেয়েকে নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার এক নতুন আশ্রয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কচুয়া উপজেলার দক্ষিণ শাসনপাড়া গ্রামের ফুলবানু বেগম দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে জীবনযাপন করে আসছিলেন। দৃষ্টিহীন হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাপন তাঁর জন্য ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তার ওপর সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে বসবাস করতে হতো তাঁকে। নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করা থেকে শুরু করে মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন—সবকিছুই ছিল তাঁর জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ।
একটি নিরাপদ বসতঘর ছিল ফুলবানুর কাছে অনেকটা অধরা স্বপ্ন। বৃষ্টি, ঝড় কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় জরাজীর্ণ ঘরে বসবাসের অনিশ্চয়তা তাঁর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলত। নিজের অসহায় জীবনের পাশাপাশি মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁকে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো।
ফুলবানু বেগমের এমন মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র স্থানীয় সাংবাদিক জিসান আহমেদ নান্নুর নজরে আসে। অসহায় এই নারী ও তাঁর মেয়ের দুর্বিষহ জীবনযাপনের বিষয়টি তিনি সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরেন। উদ্দেশ্য ছিল, সমাজের সামর্থ্যবান ও মানবিক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা, যাতে ফুলবানুর জীবনে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসে।
সাংবাদিকের প্রকাশিত প্রতিবেদনটি নজরে আসে জীবন চৌধুরী ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফয়সাল চৌধুরী জীবনের। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় থেকে তিনি ফুলবানুর খোঁজখবর নেন এবং তাঁর বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেন।
ফুলবানুর দুরবস্থার কথা জানতে পেরে তিনি তাঁর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন। ইতিমধ্যে ঘর নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা পেরিয়ে ফুলবানু বেগম ও তাঁর মেয়ের জন্য তৈরি হয়েছে নিরাপদে বসবাসের নতুন সুযোগ।
নতুন ঘর পেয়ে আবেগাপ্লুত ফুলবানু বেগম নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘ অনেক বছর পর স্বস্তিতে ঘুমাতে পারব। আমাকে নতুন ঘর করে দেওয়ায় ফয়সাল চৌধুরী জীবন ও সাংবাদিক জিসান ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’
চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া শিশুটির শিক্ষাজীবন যেন অভাবের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সমাজের মানবিক ও সামর্থ্যবান মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। যথাযথ সহায়তা পেলে শিশুটি ভবিষ্যতে শিক্ষিত হয়ে নিজের জীবন সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
একটি নিরাপদ ঘর শিশুটির পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই এই উদ্যোগকে শুধু একটি ঘর নির্মাণের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি একজন অসহায় মা ও তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হওয়ার উপলক্ষ।
অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্যও একটি বার্তা বহন করে। মানুষের প্রকৃত পরিচয় শুধু তাঁর সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থানে নয়; বরং অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায়।
ফুলবানু বেগমের জন্য নির্মিত ঘরটি হয়তো তাঁর জীবনের সব সমস্যার সমাধান নয়। তবে এটি তাঁর দীর্ঘদিনের অনিরাপত্তা দূর করার পাশাপাশি নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ তৈরি করেছে।
মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাঁদের জীবনযাপনের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করাই হোক সমাজের সবার অঙ্গীকার।


