স্টাফ রিপোর্টার
দীর্ঘ ২২ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটছে আজ। মধ্যরাতের পরই পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ শিকারে নামতে প্রস্তুত চাঁদপুরের অর্ধলক্ষাধিক জেলে। নৌকা মেরামত, জাল প্রস্তুত ও মাছ ধরার সরঞ্জাম গুছিয়ে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততায় সময় পার করছেন তারা। নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা পড়বে—এমন আশায় বুক বাঁধছেন জেলেরা। তাদের প্রত্যাশা, ইলিশ বিক্রির আয় দিয়ে কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারবেন। তবে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে কিছু জেলের আইন অমান্য করে মাছ শিকারের অভিযোগ থাকায় নদীতে ইলিশের প্রাপ্যতা নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে।
জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে গত ৮ অক্টোবর থেকে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনাসহ নির্ধারিত নদ-নদীতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এ সময় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ বন্ধ রাখার পাশাপাশি ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। আজ ২৯ অক্টোবর দিবাগত মধ্যরাতে এ নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে। এরপর নিয়ম মেনে নদীতে মাছ ধরতে নামবেন জেলেরা।
নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার আগে থেকেই চাঁদপুর সদর, মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ, হাইমচরসহ নদীতীরবর্তী এলাকার জেলেপল্লিতে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। কেউ পুরোনো জাল মেরামত করছেন, কেউ নতুন জাল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করছেন। নৌকা মেরামতের কাজও শেষ করেছেন অনেকে। দীর্ঘ বিরতির পর নদীতে ফেরার অপেক্ষায় থাকা জেলেদের চোখেমুখে এখন নতুন স্বপ্ন। তাদের আশা, পদ্মা-মেঘনার বুকে জাল ফেলেই ফিরবে জীবিকার স্বস্তি।
তবে নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন অনেক জেলে পরিবারের জন্য ছিল আর্থিক সংকটের সময়। নদীতে মাছ ধরতে না পারায় আয় বন্ধ থাকলেও সংসারের খরচ থেমে থাকেনি। জেলেদের অভিযোগ, সরকারি খাদ্যসহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এর সঙ্গে রয়েছে এনজিও ও বিভিন্ন সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ। ফলে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরপরই মাছ ধরে আয়-রোজগার বাড়ানো এবং ধারদেনা পরিশোধের প্রত্যাশা করছেন তারা।
এদিকে, মা ইলিশ রক্ষায় এবারের অভিযান অন্যান্য বছরের তুলনায় কঠোর ছিল বলে দাবি করেছে প্রশাসন। জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২২ দিনের অভিযানে প্রায় ৪ শতাধিক জেলেকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা ও মৎস্য আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে। এ সময় জব্দ করা হয়েছে প্রায় ১২ লাখ মিটার অবৈধ জাল। জেলা টাস্কফোর্স, নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সমন্বিত অভিযানে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নজরদারি অব্যাহত ছিল।
নিষেধাজ্ঞার সময় আইন অমান্য করে কিছু জেলের মাছ শিকারের অভিযোগ থাকায় এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে নদীনির্ভর জেলেদের মধ্যে। তাদের আশঙ্কা, প্রজনন মৌসুমে নির্বিঘ্নে ইলিশের বংশবিস্তার নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে নদীতে ইলিশের উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জানান, মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে জেলা টাস্কফোর্স, নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ইলিশের উৎপাদন ও প্রজনন রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী সময়েও মৎস্য আইন মেনে চলা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার সুফল পেতে হলে নদীতে ইলিশ আহরণের ক্ষেত্রে আইন মেনে চলতে হবে। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, ছোট ফাঁসের জালে পোনা ধরা এবং অন্যান্য অনিয়ম বন্ধে নজরদারি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের ন্যায্য সহায়তা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ ২২ দিনের বিরতি শেষে আবারও জীবিকার সন্ধানে নদীতে নামবেন চাঁদপুরের অর্ধলক্ষাধিক জেলে। তাঁদের প্রত্যাশা, পদ্মা-মেঘনায় মিলবে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ, কমবে ঋণের চাপ, স্বস্তি ফিরবে পরিবারে। এখন দেখার বিষয়, মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার সুফল কতটা প্রতিফলিত হয় নদীতে ইলিশের প্রাপ্যতায় এবং জেলেদের জীবিকায়।


