চাঁদপুরে মামলা-সীমানা বিরোধ ও মেয়াদ জটিলতায় প্রথম ধাপে ভোটের বাইরে থাকছে ৯ ইউনিয়ন

ইসহাক ইসলাম জায়ান

চাঁদপুর জেলার আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মামলা-সংক্রান্ত জটিলতা, সীমানা বিরোধ, পৌরসভা ঘোষণা এবং বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ না হওয়ায় জেলার অন্তত ৯টি ইউনিয়নে প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এর মধ্যে কয়েকটি ইউনিয়নে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সাধারণ নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে নতুন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সেবা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও জনপ্রতিনিধিত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নির্বাচনের উপযোগী ইউনিয়নগুলোর তথ্য যাচাই ও সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। গত ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখা থেকে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি জারি করা হয়। চিঠিতে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রস্তুত করা তালিকা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি নির্বাচনের উপযোগী ইউনিয়ন পরিষদের তালিকা পুনরায় যাচাই করতে বলা হয়েছে।

নির্দেশনায় ইউনিয়নের নাম, বাদ পড়া ইউনিয়ন, মামলা, সীমানা-সংক্রান্ত বিরোধ, ভোটার তালিকার পুনর্বিন্যাস এবং অন্যান্য আইনগত ও প্রশাসনিক জটিলতা যাচাইয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো ধরনের তথ্যগত সমস্যা থাকলে আগামী ৮ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়-৩ শাখায় পাঠাতে বলা হয়েছে। আর তালিকার তথ্য সঠিক থাকলে লিখিতভাবে তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের এই নির্দেশনার পর চাঁদপুরের দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন আটকে থাকা ইউনিয়নগুলোর বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। মতলব দক্ষিণের নারায়নপুর ও হাজীগঞ্জে সদ্য ঘোষিত অলিপুর ইউনিয়নসহ জেলার মোট ৯১টি ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ৪টি ইউনিয়নে মামলা ও সীমানা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। অন্যদিকে, আরও পাঁচটি ইউনিয়নে বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ না হওয়ায় প্রথম ধাপের নির্বাচনে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। তবে মেয়াদ শেষ হলে ওই পাঁচটি ইউনিয়নে নির্বাচন হওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। তবে সেটিও অন্তত ২০২৮ সালে হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানান তিনি।

মতলব দক্ষিণ উপজেলার ৫ নম্বর নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘ প্রায় ২৪ বছর ধরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সর্বশেষ ২০০২ সালে এ ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর ২০১০ সালের ১৫ জুলাই তৎকালীন সরকার নারায়ণপুর ইউনিয়নকে পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু পৌরসভা গঠন, সীমানা নির্ধারণ, ওয়ার্ড বিন্যাস এবং স্থানীয় ভোটারদের আপত্তিকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আইনি জটিলতায় পড়ে। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন প্রক্রিয়া আটকে থাকে।

এতে ইউনিয়ন ও পৌরসভা-সংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং জনপ্রতিনিধি নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় নতুন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়েও ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এ জটিলতার প্রভাবের মধ্যে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্ট পৌরসভার বৈধতা বহাল রাখেন। এরপরও দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন প্রক্রিয়া কার্যকর করা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।

মতলব উত্তর উপজেলার ৯ নম্বর জহিরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদে প্রায় পাঁচ বছর ধরে নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর তৃতীয় ধাপে এ ইউনিয়নের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সীমানা বিরোধ ও এ-সংক্রান্ত আইনি মামলার কারণে ভোটগ্রহণের ঠিক আগে নির্বাচন কমিশন এ ইউনিয়নের নির্বাচন কার্যক্রম স্থগিত করে। পরবর্তীতে ২০২২ সালেও পুনরায় নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আইনি জটিলতার সমাধান না হওয়ায় তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর পার হলেও এ ইউনিয়নে নতুন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ইউনিয়নটির চরাঞ্চল মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সীমানা নির্ধারণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা দাবি রয়েছে।

সদর উপজেলার ১১ নম্বর ইব্রাহিমপুর ইউনিয়ন পরিষদেও সীমানা বিরোধ ও আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন নির্বাচন বন্ধ ছিল। সর্বশেষ ২০১১ সালের পর এ ইউনিয়নে আর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। মেঘনা নদীর গতিপথ পরিবর্তন, নদীভাঙন এবং পার্শ্ববর্তী শরীয়তপুর জেলার সঙ্গে সীমানা-সংক্রান্ত বিরোধ এ জটিলতার অন্যতম কারণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট আইনি জটিলতা কেটে যাওয়ায় দীর্ঘ বিরতির পর ইউনিয়নটিতে নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ২০২৭ সালের শুরুতে চাঁদপুর সদরের অন্যান্য ইউনিয়নের সঙ্গে ইব্রাহিমপুরেও নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির কথা জানা গেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের মধ্যে ইতোমধ্যে তৎপরতা শুরু হয়েছে।

সদর উপজেলার ১৪ নম্বর রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদেও দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সর্বশেষ ২০১১ সালে এ ইউনিয়নে নির্বাচন হয়। পরিষদের মেয়াদ ২০২১ সালের ৩১ মার্চ শেষ হলেও সীমানা-সংক্রান্ত মামলা ও আইনি জটিলতার কারণে নতুন নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়নি। পদ্মা-মেঘনার ভাঙনে ইউনিয়নটির ভৌগোলিক অবস্থান প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। চরাঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, নদীভাঙন এবং সীমানা নির্ধারণের জটিলতা প্রশাসনিক কার্যক্রমকেও কঠিন করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রত্যাশা রয়েছে।

এদিকে মামলা ও সীমানা-সংক্রান্ত জটিলতার বাইরে চাঁদপুর জেলার আরও পাঁচটি ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ না হওয়ায় প্রথম ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। ইউনিয়নগুলো হলো—মতলব দক্ষিণ উপজেলার খাদেরগাঁও ইউনিয়ন, হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী ও গাজীপুর ইউনিয়ন, ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়ন এবং হাজীগঞ্জ উপজেলার দ্বাদশগ্রাম ইউনিয়ন। এসব ইউনিয়নে বর্তমান পরিষদের মেয়াদ পূর্ণ না হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের প্রথম ধাপের নির্বাচনের উপযোগী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সীমানা নির্ধারণ, আদালতে বিচারাধীন মামলা, পৌরসভা-সংক্রান্ত বিরোধ এবং মেয়াদের বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা জরুরি। অন্যথায় দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন থেকে বঞ্চিত ইউনিয়নগুলোর বাসিন্দাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

চাঁদপুরের এসব ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নারায়ণপুর, জহিরাবাদ, ইব্রাহিমপুর ও রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের বাসিন্দারা দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসন করে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়ে আসছেন।

এখন নির্বাচন কমিশনের তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় এসব ইউনিয়নের প্রকৃত অবস্থা কীভাবে উঠে আসে এবং আইনগত ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেটিই দেখার বিষয়।

এসব বিষয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান খলিফা বলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা নির্বাচন কার্যালয় ইউপি নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সকল ইউনিয়নের ভোটার হালনাগাদ ও অন্যান্য কার্যাদি চলমান আছে। যেসব ইউনিয়নে আইনি জটিলতা রয়েছে সেগুলোর বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।