“ইসলামই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মৌলিক অনুপ্রেরণা” কোরআন ও হাদিসের আলোকে পর্যালোচনা:
১. কোরআনের আলোকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎসাহ
ক) জ্ঞান অন্বেষণের নির্দেশ
“বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?”
— সূরা যুমার, আয়াত ৯
এখানে আল্লাহ স্পষ্টভাবে জ্ঞানীদের মর্যাদা তুলে ধরেছেন। জ্ঞান বলতে কেবল ধর্মীয় নয় — সব ধরনের উপকারী জ্ঞান, যার মধ্যে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রকৌশল, জ্যোতির্বিদ্যা অন্তর্ভুক্ত।
খ) পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের নির্দেশ-
“তোমরা কি ভেবে দেখো না আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি বিষয়ে?…” — সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৯১
এ আয়াতে মানুষের চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃতি বোঝার কথা বলা হয়েছে, যা বিজ্ঞানের ভিত্তি।
গ) প্রকৃতিকে অনুসন্ধান ও নিয়ন্ত্রণের আহ্বান
“তিনি (আল্লাহ) তোমাদের জন্য সকল কিছুকে (পৃথিবীতে) করেছেন অধীন…”
— সূরা জাসিয়া, আয়াত ১৩
এখান থেকে স্পষ্ট হয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষকে সৃষ্টিকে কাজে লাগাতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
ঘ) জ্যোতির্বিদ্যা ও মহাকাশ অনুসন্ধানে নির্দেশ
“তিনিই সূর্যকে দীপ্তিমান করেছেন এবং চন্দ্রকে করেছেন আলো দানকারী এবং এর জন্য পর্যায় নির্ধারণ করেছেন…”
— সূরা ইউনুস, আয়াত ৫
এই আয়াতে সময় গণনা, ক্যালেন্ডার, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ — যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি — তা বোঝার নির্দেশ আছে।
২. হাদীসের আলোকে বিজ্ঞান ও গবেষণার গুরুত্ব
ক) জ্ঞান অর্জনের ফজিলত
“জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর ফরজ।”- (ইবনু মাজাহ)
এই হাদীস প্রযুক্তি, চিকিৎসা, প্রকৌশলসহ সব উপকারী জ্ঞান অর্জনের ইসলামী নির্দেশনা দেয়।
খ) দূর দেশে হলেও জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ-
“জ্ঞান অর্জনের জন্য তোমাদের যদি চীনে যেতেও হয়, তবে তা করো।” — (আল-বায়হাকি)
চীন সে যুগে মুসলিম বিশ্বের বাইরে ছিল এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অগ্রসর দেশ ছিল। অর্থাৎ রাসূল ﷺ বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন।
গ) চিকিৎসা ও গবেষণার অনুমোদন
রাসূল ﷺ বলেন:
“আল্লাহ কোনো রোগ দেননি, যার কোনো চিকিৎসা নেই।”
— (বুখারি, মুসলিম)
এ হাদীস চিকিৎসা বিজ্ঞান ও গবেষণার ভিত্তি। এটি চিকিৎসা খাতে বিজ্ঞানচর্চার স্পষ্ট অনুমোদন।
৩. ইসলামের সোনালি যুগে বিজ্ঞানচর্চার বাস্তব উদাহরণ
ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই মুসলিমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পথিকৃত ছিলেন। তাদের অনুপ্রেরণা ছিল কোরআন ও হাদীস।
কিছু ঐতিহাসিক উদাহরণ:
আল খারাজমি: আধুনিক অ্যালজেবরার জনক
ইবনে হাইথাম: অপটিক্স ও ক্যামেরা তত্ত্বের প্রবর্তক
ইবনে সিনা: চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী
জাবির ইবনে হাইয়ান: আধুনিক রসায়নের জনক
আল-বেরুনী: ভূগোল, পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিশ্ববিখ্যাত
এই সব গবেষকগণই ইসলামি অনুপ্রেরণায় বিজ্ঞানে কাজ করেছেন।
অবশেষে:
ইসলাম কখনোই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিপরীত নয় — বরং এটি তার মৌলিক অনুপ্রেরণা।
কোরআন ও হাদীস বারবার মানুষকে ভেবে দেখা, গবেষণা করা, জ্ঞান অর্জন এবং সৃষ্টিকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানায়। অতএব, একজন প্রকৃত মুসলমানের কর্তব্য—আখিরাতের জন্য যেমন প্রস্তুতি নেয়, তেমনি দুনিয়ায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে মানবতার কল্যাণ সাধনে এগিয়ে থাকা।


