স্টাফ রির্পোটার:
চাঁদপুরের হাইমচরে নিজেকে পীর দাবি করা এক নারীর আস্তানাকে কেন্দ্র করে ভক্তদের সঙ্গে স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গান-বাজনার অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুক্রবার থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্থানীয় মসজিদের ইমামসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। পরে উত্তেজিত এলাকাবাসী কথিত নারী পীরের আস্তানায় ভাঙচুর চালানোর অভিযোগও উঠেছে।
শুক্রবার (২৬ জুন) উপজেলার ২ নম্বর উত্তর আলগী দুর্গাপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ছোটলক্ষীপুর গ্রামের বরকন্দাজ বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রহিম ও তার স্ত্রী হাসিনা আক্তার ওরফে সেলিনা বেগম দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করে আসছেন। সেলিনা বেগম নিজেকে পীর পরিচয় দিয়ে একটি আস্তানা পরিচালনা করতেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই আস্তানায় দীর্ঘদিন ধরে কবিরাজি চিকিৎসার নামে নানা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।
আশুরা উপলক্ষে শুক্রবার বাড়িটি বিভিন্ন রঙের পতাকা, কাবা শরিফের গিলাফ ও আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। সকালে কুরআন খতম এবং প্রায় ২০০ মানুষের জন্য গরুর মাংসের বিরিয়ানির আয়োজন করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, কুরআন খতম শেষে লাউডস্পিকারে উচ্চশব্দে মাজারভিত্তিক গান-বাজনা শুরু হলে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি শান্ত করতে স্থানীয় আলেম, মসজিদের ইমাম ও মুসল্লিরা গান-বাজনা বন্ধের অনুরোধ জানাতে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। মুসল্লিদের অভিযোগ, একপর্যায়ে কথিত পীর ও তার অনুসারীরা তাদের ওপর হামলা চালায় এবং মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এতে স্থানীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা ইমরান হোসেনের বাম হাতের কব্জিতে গুরুতর জখম হয়। এছাড়া আরও অন্তত ১০ জন আহত হন। গুরুতর আহত ইমামকে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত গ্রামবাসী ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে কথিত পীর দম্পতির বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় আস্তানার প্রবেশ গেট, সামিয়ানা ও বসতঘরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এ ঘটনায় কথিত পীরের পক্ষের কেউ আহত হয়নি বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় মসজিদের খতিব মাওলানা ইব্রাহিম বলেন, ‘কোনো প্রকৃত মুসলমান ওরস বা মাজার পূজায় বিশ্বাস করতে পারে না। ইসলামের মৌলিক বিধান পালনের বাইরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়।’
ঘটনার খবর পেয়ে হাইমচর থানা পুলিশ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম শফিক পাটওয়ারী বলেন, ‘পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার খবর পেয়ে পুলিশসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। আপাতত ওই আস্তানার কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত হাসিনা আক্তার ওরফে সেলিনা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো অন্যায় করিনি। আশুরার অনুষ্ঠান ও মিলাদ চলছিল। কিন্তু তারা এসে আমাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেছে।’
নারী পীরের স্বামী আবদুর রহিম দাবি করেন, ভাঙচুরের সময় তাদের বাড়ি থেকে হাঁস-মুরগি, কবুতর, প্রায় পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার এবং ঘর নির্মাণের জন্য রাখা প্রায় পাঁচ লাখ টাকা লুট করা হয়েছে। এছাড়া ফ্রিজ, আলমারি ও টিনের ঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. রবিউল হাসান বলেন, ঘটনার পরপরই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়েছে। বর্তমানে এলাকাটি পুলিশি নজরদারিতে রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


