স্টাফ রিপোর্টার:
চাঁদপুর জেলা শহর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীর তীরঘেঁষা হাইমচর উপজেলা এখন সম্ভাবনার নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একসময় নদীভাঙন ও চরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এ জনপদ আজ পর্যটন, কৃষি, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের অপার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও উন্নয়নসংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে হাইমচর দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
হাইমচর উপজেলা ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে তিনটি ইউনিয়ন মেঘনার পশ্চিম পাড়ের চরাঞ্চলে এবং বাকি তিনটি পূর্ব পাড়ে অবস্থিত। আলগী উত্তর ইউনিয়নের কাটাখালি থেকে দক্ষিণ ইউনিয়নের চরভাঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত মেঘনা নদীর তীরকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এখানে একটি আধুনিক মেরিন ড্রাইভ, নিরাপদ পরিবেশ ও পর্যাপ্ত পর্যটনসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে।
সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, ২০১৮ সালের এপ্রিলে চরভাঙ্গা এলাকায় বাংলাদেশ স্কাউটসের ষষ্ঠ জাতীয় কমডেকা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চরাঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মেঘনা নদীর তীরে মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। স্থানীয়রা সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন এখনও প্রত্যাশা করছেন।
মেঘনা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, সবুজ কৃষিজমি, পানের বরজ ও সুপারির বাগান হাইমচরকে প্রাকৃতিকভাবে অনন্য বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে হাইমচর পরিচিতি পেতে পারে।
কৃষিই হাইমচরের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। ধান, গম, মরিচ, শাকসবজি, পান ও সুপারির ব্যাপক উৎপাদন হয় এ উপজেলায়। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি, মধ্যচরে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন) দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। তাদের মতে, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এলাকাবাসী হাইমচরের উন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে হাইমচরকে পৌরসভায় উন্নীত করা, জেলা শহর থেকে উপজেলা সদর পর্যন্ত দুই লেনের সড়ক নির্মাণ, একটি আধুনিক স্টেডিয়াম স্থাপন, পর্যটন ও শিল্পাঞ্চলের জন্য পরিকল্পিত ভূমি উন্নয়ন এবং মেঘনা নদীর তীরে আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ।
এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নেও জোর দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৫০ শয্যার ভবনের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। একই সঙ্গে চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে নিয়মিত স্পিডবোট সার্ভিস চালু এবং চরাঞ্চলে একটি সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি, যোগাযোগব্যবস্থা ও ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে হাইমচর একটি সম্ভাবনাময় উপজেলা। পরিকল্পিত উন্নয়ন, টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে হাইমচর ভবিষ্যতে চাঁদপুর জেলার অন্যতম পর্যটন, শিল্প ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এতে স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।


