স্টাফ রিপোর্টার:
ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে অনলাইনভিত্তিক জনসেবা সহজ ও দ্রুত করতে স্থাপন করা হয়েছিল অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক। চাঁদপুরের চার উপজেলার ২৭টি ইউনিয়ন পরিষদও এ প্রকল্পের আওতায় আসে। তবে স্থাপনের পর কিছুদিন যেতে না যেতেই অধিকাংশ নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি অর্থে স্থাপন করা মূল্যবান সরঞ্জাম পড়ে আছে অলস অবস্থায়। বাধ্য হয়ে বিকল্প বেসরকারি ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে নাগরিক সেবা দিচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদগুলো।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এগিয়ে নিতে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার দেশব্যাপী অপটিক্যাল ফাইবার হোম সার্ভিস প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের এক হাজার ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপনে ব্যয় হয়েছে হাজার কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় চাঁদপুরের চার উপজেলার ২৭টি ইউনিয়ন পরিষদে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রম অনলাইনভিত্তিক করা এবং জনগণের কাছে দ্রুত ও সহজে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু বর্তমানে এসব ইউনিয়নের অধিকাংশ নেটওয়ার্কই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, ফাইবার সংযোগে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা না পাওয়ায় অনলাইনভিত্তিক নাগরিক সেবা দিতে তারা বেসরকারি ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করছেন। ফলে সরকারি অর্থে স্থাপন করা নেটওয়ার্কটি কার্যত কোনো কাজে আসছে না।
এদিকে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের বিভিন্ন সরঞ্জাম পড়ে থাকলেও সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। নেটওয়ার্ক সচল না থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে এসব সরঞ্জামের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু রাখতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের জটিলতা।
বাকিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, নেটওয়ার্কটি কার্যকর থাকলে ইউনিয়ন পরিষদের অনলাইনভিত্তিক সেবা আরও সহজ ও দ্রুত দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু সংযোগ সচল না থাকায় বিকল্প ব্যবস্থায় সেবা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
এদিকে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপনে প্রতিটি ইউনিয়নে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে এবং কাজের মান যাচাইয়ের কোনো প্রতিবেদন রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। বিটিসিএল কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। তবেবিটিসিএলের চাঁদপুর কার্যালয়ের সহকারী ব্যবস্থাপক হাসিব আহমেদ জানান, প্রয়োজনীয় ওএনইউ (ঙঘট) ও রাউটার ইউনিয়ন পরিষদ সংগ্রহ করতে পারলে নেটওয়ার্ক পুনরায় সচল করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি অর্থে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, এর কার্যকারিতা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সরকারি বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
টিআইবি চাঁদপুরের সাবেক সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন বলেন, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যথাযথ তদারকি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নেটওয়ার্ক স্থাপনের পর তা কেন সচল রাখা যাচ্ছে না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
চাঁদপুরের ২৭টি ইউনিয়নে সরকারি অর্থে স্থাপন করা অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকায় প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ও বাস্তব সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন—ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যদি তৃণমূল পর্যায়ে এর সেবা না পৌঁছে, তাহলে এ বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে কীভাবে?


