স্টাফ রিপোর্টার
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরাশক্তিগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক, কৌশলগত, সামরিক ও রাজনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করে। ফলে পরাশক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও নীতিগত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা।
বর্তমানে বিশ্বব্যবস্থা একমেরুকেন্দ্রিকতা থেকে ধীরে ধীরে বহুমেরুকেন্দ্রিকতার দিকে এগোচ্ছে। চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উত্থান, ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি, রাশিয়ার কৌশলগত ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বাণিজ্যপথ, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঘিরে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত গুরুত্বও বেড়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, বাজার, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদের কারণে বাংলাদেশ বিভিন্ন শক্তির কাছে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে।
ড. মাহরুফ চৌধুরীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন দেশের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাজারসুবিধা, উন্নয়ন সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে পারে। তবে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হলে নীতিগত স্বাধীনতা ও কৌশলগত সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলো মূলত নিজেদের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। এ কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও আবেগ বা সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
লেখাটিতে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের জন্য তিনটি কৌশলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে—কোনো পরাশক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোটে যাওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির বিরুদ্ধে ভারসাম্য তৈরি করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী একাধিক শক্তির সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক রেখে ঝুঁকি কমানো। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি। সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদেও জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায় এই নীতির আধুনিক রূপ হতে পারে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’। অর্থাৎ কোনো একটি শক্তির বলয়ে পুরোপুরি যুক্ত না হয়ে জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং জাপানের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারত্ব—সবকিছুকেই জাতীয় স্বার্থের আলোকে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
লেখাটিতে আরও বলা হয়েছে, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতির বিষয় নয়। এর সঙ্গে অর্থনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা যত শক্তিশালী হবে, আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে তার স্বাধীনতাও তত বাড়বে।
এ ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতাও আলোচনায় এসেছে। এসব দেশ বিভিন্ন পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে লেখকের মতে, এসব দেশের মডেল সরাসরি অনুসরণ না করে তাদের অভিজ্ঞতা থেকে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাই কূটনৈতিক ভারসাম্যের অর্থ কোনো একটি শক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি বিবেচনা করে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
ড. মাহরুফ চৌধুরীর মতে, পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতির ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট মৌলিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে বাংলাদেশের নীতিগত স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তাই দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে ন্যূনতম ঐকমত্য প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামনে পরাশক্তির প্রতিযোগিতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে এই প্রতিযোগিতাকে জাতীয় উন্নয়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, মানবসম্পদ ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির সুযোগে পরিণত করা সম্ভব। এজন্য অন্যরা বাংলাদেশকে কীভাবে দেখছে তার চেয়ে বাংলাদেশ নিজে কী অর্জন করতে চায়—সে বিষয়ে সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
লেখাটির শেষাংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তি হবে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা এবং জাতীয় কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ময়দান না হয়ে নিজেদের স্বার্থের ভিত্তিতে অংশীদার বেছে নেওয়া একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও কৌশলগতভাবে স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র গঠনের পথ তৈরি করতে পারে।


