স্টাফ রিপোর্টার
শিউলি ফুলের সুবাস আর কাশফুলের দোলায় প্রকৃতিতে জানান দিচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনি বার্তা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে ঘিরে চাঁদপুরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও প্রতিমায় শেষ তুলির আঁচড় দিচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা, আবার কোথাও চলছে পূজামণ্ডপ সাজানোর কাজ। উৎসবকে আনন্দমুখর করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজকরা।
আজ ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গাপূজা। এ বছর চাঁদপুর জেলার আটটি উপজেলায় মোট ২৩২টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব মণ্ডপে প্রতিমা তৈরি, সাজসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে কয়েক শ মৃৎশিল্পী ও শ্রমিক দিনরাত কাজ করেছেন।
জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায় ও সাধারণ সম্পাদক তমাল কুমার ঘোষ জানান, এ বছর চাঁদপুরের আটটি উপজেলায় মোট ২৩২টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে চাঁদপুর সদর উপজেলায় ৪১টি, ফরিদগঞ্জে ২৩টি, হাইমচরে ৬টি, হাজীগঞ্জে ২৯টি, মতলব দক্ষিণে ৩৯টি, মতলব উত্তরে ৩৬টি, কচুয়ায় ৩৯টি এবং শাহরাস্তিতে ১৯টি পূজামণ্ডপ রয়েছে।
চাঁদপুর সদর উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের আহ্বায়ক লক্ষ্মণ চন্দ্র সূত্রধর জানান, সদর উপজেলায় এবার ৪১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে চাঁদপুর পৌর এলাকায় ৩৫টি এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ছয়টি মণ্ডপ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের কালীবাড়ি মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন, গোপাল জিউর আখড়া, গুয়াখোলা দুর্গামন্দির, ডগ লাইন হরিজন পল্লী, স্বর্ণখোলা হরিজন পল্লী, কদমতলা অকালবোধন সংঘ, নতুন বাজার ঘোষপাড়া, গুহবাড়ি, মেথা রোড পূজামণ্ডপ, পুরান বাজার দাসপাড়া, বারোয়ারী মন্দির, নিতাইগঞ্জ ও হরিসভা মন্দিরসহ বিভিন্ন মণ্ডপে চলছে সাজসজ্জার কাজ। প্রতিমা, প্যান্ডেল ও আলপনায় সাজানো হচ্ছে মণ্ডপগুলো। কয়েকটি মণ্ডপে থাকছে ভিন্নধর্মী থিম ও নান্দনিক আয়োজন।
চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করেছেন ফরিদপুর থেকে আসা জীবন পাল, জগবন্ধু পাল, গোবিন্দ পালসহ কয়েকজন পাল বংশীয় মৃৎশিল্পী। তাঁরা প্রায় এক মাস ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করেছেন।
কালীবাড়ি মন্দিরের পূজা আয়োজক কমিটির সদস্য রতন মিত্র, অমল রক্ষিত মনা, নারায়ণ মজুমদার ও অ্যাডভোকেট প্রভাষ সাহাসহ সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় এক মাস ধরে মৃৎশিল্পীরা প্রতিমা তৈরির কাজ করেছেন। পূজার পাঁচদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য মহাপ্রসাদের ব্যবস্থা থাকবে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও প্রসাদ বিতরণ করা হবে। এবার প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ মানুষের সমাগম হবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, সবাইকে নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপন করতে হবে। সব পূজামণ্ডপকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা এবং কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাতে অপতথ্য ছড়াতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সবাইকে পূজা উদ্যাপন পরিষদকে সহযোগিতা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, চাঁদপুর পৌরসভাসহ সব পৌরসভাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো পূজামণ্ডপে সমস্যা থাকলে প্রশাসনকে জানাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হলে জেলা প্রশাসনকে অথবা নিয়ন্ত্রণকক্ষে অবহিত করতে হবে। পূজার সময় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে আলাদা মেডিক্যাল টিম রাখা হবে। পূজামণ্ডপের আশপাশে দোকান বা বাজার থাকতে পারলেও কোনোভাবেই মেলা বসানো যাবে না। কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রোধেও নজরদারি বাড়ানো হবে।
চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক বলেন, দুর্গাপূজায় তাঁর দলের নেতাকর্মীরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মণ্ডপ কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন। নির্বিঘ্নে পূজা উদ্যাপনে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হোক, তা তাঁরা চান না। এ বিষয়ে দলীয় প্রধান তারেক রহমানের নির্দেশনাও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলসহ সবার সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সুন্দরভাবে পূজা উদ্যাপন সম্ভব। পূজামণ্ডপগুলোতে সামর্থ্য অনুযায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে। পূজা উপলক্ষে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
উৎসবকে ঘিরে চাঁদপুরজুড়ে এখন বিরাজ করছে আনন্দমুখর পরিবেশ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, প্রতিমা দর্শন ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপন করবেন।


