মঠখোলায় উপড়ে গেলো ঐতিহাসিক ৫ শতবর্ষী পুরানো বটগাছ

সাগর আচার্য্য:
কালের সাক্ষী হয়ে ৫০০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো চাঁদপুর সদর উপজেলা পৌরসভাধীন মঠখোলা এলাকার বট গাছগুলো। এই স্থানটিকে এলাকার মানুষ শিব খোলা নামেই চিনে। এগুলোকে শুধু বট গাছ বললে ভুল হবে, এ গাছ শত শত বছরের স্মৃতি। একটি নির্দিষ্ট এলাকায়  ছড়িয়ে পড়েছিলো গাছটির বিশাল শাখা প্রশাখা। শিকড় বাকড়ে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। এ বট গাছকে ঘিরে রয়েছে নানা রহস্য নানা ঘটনা নানা স্মৃতি।

এ গাছের ডালপালা যেমন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে তেমনি এর গল্প কাহিনী আর কল্পগাথাও বছরের পর বছর ধরে ডালপালা গজিয়েছে।

কিছুটা বার্ধক্যের ছাপ পড়ে গেছে তাদের গায়ে। এই কারণেই গতকাল শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৮টায় এই স্থানের ৪টি গাছের মধ্যে ২টি গাছ হঠাৎ মাটি থেকে উপড়ে গেছে।

গাছটি উপড়ে পড়ার খবর চারিদিকে জানাজানি হলে সেখানে দেখতে আসে আশপাশে বসবাসরত  অনেক মানুষ। গাছটির বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন অনেক ইতিহাস অনুসন্ধানীরা। এসব বিবেচনায় এলাকাবাসীর দাবি উঠেছে অবশিষ্ট ২টি গাছকে প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে টিকিয়ে রাখার। মূল্যবান সম্পদ হিসেবেও রক্ষণাবেক্ষণের দাবি সচেতন মহলের। ইতিহাস ঐতিহ্যের অনেক দুর্লভ স্মৃতি এ গাছটি মূল্যবান উপাদান হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় গাছটিকে ঘিরে প্রতিবছরই পূজা অর্চনা করে থাকেন যা এখনো চলমান এবং এই স্থানের নামেই অত্র এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বাড়ি রয়েছে যার নাম শিব বাড়িয়া ঠাকুর বাড়ি। গাছটির ঝুলন্ত লতা আর শেকড় নেমে শত শত গাছের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে আবার মান্নত বা মনের আশা পূরণের জন্যও গাছটিকে বেছে নেয়। মুসলিমরা গাছটিকে উপকারী বৃক্ষ হিসেবে সমীহ করে।

একসময় চৈত্র সংক্রান্তিতে এই গাছের নিচেই বসতো মঠখোলা বাজারের শিব বাড়িয়া মেলা।

এই বিস্তৃত বটগাছের দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাখির কলকাকলি মুখরিত শীতল পরিবেশ বিমুগ্ধ চিত্তকে বিস্ময় ও আনন্দে অভিভূত করে। এ গাছটি শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নয় এ যেন দর্শনীয় আশ্চর্য্যের কোন উপাদান। প্রায় ৫ শতক জমির উপরে এ গাছটি এলাকাবাসীর কাছে দারুণ কৌতুহল। বটগাছগুলোর থেকে নেমে আসা প্রতিটি ঝুড়িমূল কালের পরিক্রমায় এক একটি নতুন বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। ঝুড়িমূল থেকে সৃষ্ট প্রতিটি বটগাছ তার মূল গাছের সাথে সন্তানের মতো জড়িয়ে আছে। কথিত আছে বটবৃক্ষের নীচে বসে শীতল বাতাস গায়ে লাগালে নাকি মানুষও শতবর্ষী হয়।

স্থানীয় বয়স্ক ব্যক্তি নবু পাটোয়ারী বলেন, বাপ দাদার আমল থেকেই দেখে আসছি এই বটগাছ। দিন দিন এই বট গাছগুলো বিলুপ্তির পথে। তিনি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন ব্যক্তিসহ সংশ্লিষ্টদের বাকি গাছগুলো রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে বলেন।

এলাকার কিছু যুবক জানান, দাদার কাছে শুনেছি এ গাছের ডালপালা কাটা যেত না। এমনকি ভয়ে কেউ পাতাও ধরতো না। সেই ভয়ে এখনো অনেকে গাছের ডালপালা ভাঙে না। জাত, ধর্ম নির্বিশেষে সকলেরই ঐতিহ্যবাহী এ বটগাছগুলো রক্ষাসহ এই জায়গাটি সংস্কার করা উচিৎ।

শিব বাড়িয়া ঠাকুর বাড়ির জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি ও পল্লী চিকিৎসক নন্দলাল আচার্য জানান, এই স্থানটি আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য। এই গাছগুলোও ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে বহন করে৷ আমাদের সকলের উচিৎ আমাদের এই ধর্মীয় স্থানটি রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং এর পবিত্রতা রক্ষা করা।

আজ সকাল থেকেই উপড়ে পড়া দুটো বটগাছ সড়িয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলছে।

দীর্ঘদিনের স্মৃতি বিজরিত এ গাছগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও এই ধর্মীয় স্থানটি সংস্কারে চাঁদপুর জেলা প্রশাসক ও চাঁদপুর পৌর প্রশাসকের সু-দৃষ্টি কামনা করেন এলাকাবাসী।