চাঁদপুর শিল্পকলা মঞ্চে ‘জলরূপালী’ মঞ্চায়ন

স্টাফ রিপোর্টার :
চাঁদপুরের প্রখ্যাত নাট্য সংগঠন অনন্যা নাট্যগোষ্ঠীর পরিবেশনায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে মঞ্চায়ন হলো জনসচেতনতামূলক নাটক জল রূপালী। ২৩ মে শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় অনন্যার ৪৮তম প্রযোজনার এই নাটকটি প্রথমবারের প্রদর্শিত হলো। নাটকটির রচনায় ও নির্দেশনায় ছিলেন সকলের পরিচিতমুখ নাট্যজন জসীম মেহেদী।
জলরূপালীর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, দেশজ নাট্যরিতির আঙ্গিক নিয়ে নিজস্ব সৃজনশীলতার চেষ্টায় সত্যমূলক কাহিনী নিয়ে অনন্যা নাট্যগোষ্ঠী থেকে নির্মাণ করেছি জলরূপালী। আমার প্রাণপ্রিয় নাট্যশিল্পীরা মঞ্চে যা করেছে, তা শুধুই কেবল অভিনয়। আসল ঘটনা ঘটছে, প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজে। দর্শককুলে নাটক দেখার পর যদি বলি কাহিনীটি আগে শুনেছেন, কিংবা দেখেছেন কিনা। নিঃসন্দেহে দর্শক বলবে, এটা তাঁদের শোনা ও দেখা কাহিনী। এই দৃশ্য বহুবার দেখেছে। ঘটনার স্থানটি নদীমাতৃক চাঁদপুর জেলা। যেখানে ইলিশের বাড়ি। ইলিশের বাড়িতে ইলিশ বসবাসের উপযোগী করতেই সরকার আইন করেছে বছরে ২২ দিন এবং ২ মাস নদীতে ইলিশ না ধরার জন্য। সেই সময় কর্মহীন জেলেদের চাউল, নগদ অর্থসহ উপকরণ সহায়তা করে থাকে সরকার। নাটকের শুরুতে গায়েন বন্ধনা করে জারি গায়েন জারির সুরে কাহিনী। নরেশ মাঝি অতীত বর্তমান নিয়ে একাকী বিরবির করে। মেয়ে কাজলী বাবার কাছে বায়না করে একটা বড় ইলিশ খাওয়ার জন্য। বাবা নিত্যদিন মাছ ধরে ঘরে একটা ইলিশ আনতে পারে না। বন্ধু ছিডুর কাছে বলে। নদীতে মাছ না পাওয়ার কারণে একদিকে কিস্তি টাকা অন্য দিকে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নেয়া টাকা দিতে তো পারে না।
এর উপর মেয়ে কাজলীর বিয়ার কথাবর্তা শুরু। আবারও ৫০ হাজার টাকা কিস্তি তুলতে চায়। কিন্তু কিস্তির স্যার আগের বকেয়া টাকার কারণে নতুন করে লোন দিতে পারবে না বলে নিষেধ করে। নরেশ মাঝির মেয়ে কাজলীর বিয়ে দেয়ার জন্য বলাইরে পাত্র হিসেবে বেছে নেয়। কিন্তু মেয়ে কাজলী ভালোবাসে বাবার সাথে নাও বাওয়া মাছ ধরা নিতাইকে। মেয়ে কাজলী বাবা-মাকে বলাইর সমন্ধে বুঝানোর পর নরেশ সিদ্ধান্ত নেয় বলাইর সাথে কাজলীরে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। নরেশ নদীতে যায় বড় ইলিশ পায়। কিন্তু মহাজন সেই ইলিশ বিক্রির ডাক উঠায়। নরেশ মাঝির মেয়েরে কথা দিয়ে এসেছে বড় ইলিশ পেলে বাড়ি নিবে, তাই সে মাছ বেচবে না এ তার এক জবানের কথা। কিন্তু কি করবে অবশেষে মাছটা বিক্রি করে দেয়। কিন্তু সেই মাছ ফের নরেশ মাঝির কাছে আসে অন্যভাবে। মহাজন মাছটা আবার ডাকে তুলতে চায়। ঐ দিকে বলাই সরকারি আইন অমান্য করে কলু-নজু-ফজুসহ অভিযানের মধ্যে নদীতে মাছ ধরতে যায়। সেই সময় নদীতে পুলিশ বাহিনীর তাদের নাও লক্ষ্য করে গুলি করে গুলি এসে তাদের সাথে একজনের গায়ে লাগে। আর এভাবেই জল রূপালী তার পরিচয় বলতে থাকে।
নাটকটি উপভোগ করতে শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে শ্রোতাদের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো। এ সময় বেশ ক’জন শ্রোতার কাছে এই প্রতিবেদক ‘নাটক দেখে পরবর্তী অনুভূতি কেমন’ জানতে চাইলে তারা জানান, মঞ্চে সরাসরি অভিনয় দেখার মধ্যে একটা প্রাণ থাকে, অনুভব করার কিছু থাকে। চাঁদপুর যেহেতু ইলিশের কারনেই ব্র্যান্ডিং জেলায় স্বীকৃতি পেয়েছে, সেই ইলিশকে নিয়েই নাটকটির মূল গল্প। ইলিশ বাড়িতেই ইলিশ নিয়ে মঞ্চনাটক আমাদের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। চাঁদপুরের মানুষ হিসেবে যদিও আমাদের চোখের সামনে প্রতিনিয়তই এই ঘটনাগুলো ঘটে, কিন্তু আমরা তা ভ্রুক্ষেপ করি, বাস্তব জীবনে ইচ্ছেকৃতভাবেই আমরা নাটকের ঘটনাগুলো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা বলেই এড়িয়ে যাই। অথচ এই ইলিশ আহরণে জেলেদের যে সংগ্রাম, তা এখন অনুভব করছি। নাট্যকার ও নির্দেশক ইলিশ সংশ্লিষ্ট সকলকে একের পর এক যেভাবে মঞ্চে রূপ দিয়েছেন, সত্যি তা হৃদয়ে দাগ কাটার মতো। এক ইলিশকে নিয়েই এতো নাটকীয়তা থাকতে পারে, জল রূপালী না দেখলে বুঝতেই পারতাম না।
উল্লেখ্য, নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন : ফাতেমাতুজ জোহরা, প্রান্তিক, আবির, রাখি, বাধন, রোহান, মঈন, রাফি, আয়েদ, হাসিব, ঈমান, শুভ, নিলয়, জিহাদ, অন্তরা বিনতে মাহা, হৃদয় কর্মকার, শহীদ পাটোয়ারী, আয়শা সিদ্দিকী আভা, আলমগীর হোসেন পাটওয়ারী, সীমা ইসলাম, জসীম মেহেদী, শরীফুল ইসলাম, কামরুল ইসলাম, আখলাকুল ইসলাম লাকু, মানিক দাস, আবির, রাফি, জিহাদ, আলিফ, দুলাল সরকার, প্রান্তিক দাস, দীপক ভট্টাচার্য্য, মঈন, হাসিব ও নজরুল ইসলাম।