কাদের পলাশ
নিজে নিজে সাংবাদিকতার হাতেখড়ি নিচ্ছি। যে কারণে নিয়মিত চাঁদপুর শহরের কালীবাড়ি রেল স্টেশন থেকে একটি স্থানীয় দৈনিক তিন টাকায় নিতাম। প্রতি শনিবার চাঁদপুর কণ্ঠ অন্যদিন ইলশেপাড়। দিনটি ঠিক মনে নেই। তবে যদ্দুর মনে পড়ে ২০০৯ সালের প্রথম দিকে। ইলশেপাড় পত্রিকা পড়ছি। কিন্তু প্রেস্টিজ সমাচার লেখাটি এড়িয়ে গেলাম। এছাড়া পুরো পত্রিকা পড়া শেষ। ভরদুপুর অবসর সময় কাটছে। পরে পত্রিকাটি আবার হাতে নিয়ে ‘প্রেস্টিজ সমাচার’ পড়তে শুরু করি। লেখাটি পড়তে পড়তে নিজে নিজে অস্থির হয়ে উঠি। অস্থির বলতে হাসতে হাসতে একাকার অবস্থা। পেটের চামড়া ব্যথা। জীবনে এই প্রথম এতো হাসলাম। এরপর আরেকদিন পড়লাম ‘দুটি সমস্যা’ বাবলু ভাইয়ের সাথে পরে পরিচয় হলো জেলা বিএনপির আন্দোলনের সময়। কিন্তু মাহবুব আনোয়ার বাবলু ভাই তিনি। আর তিনিই প্রেস্টিজ সমাচার লিখেছেন অনেক পরে এসে জানতে পারি। কালীবাড়ি প্লাটর্ফমে পরিচয় করিয়ে দিলেন জসিম মেহেদী। জসিম ভাই বলেছিলেন, বাবলু ভাই রম্য লিখেন। একপর্যায়ে বললেন, প্রেস্টিজ সমাচার ও দুটি সমস্যা এমন সব দারুণ লেখা তার হাত ধরেই ফুটেছে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলি আমি দুটি লেখা পড়েছে। এরপর জসিম ভাই বললেন, তিনি কিন্তু ভাগ্যরেখা দেখেন। আমার কৌতুহলি মন ডান হাত বাড়িয়ে দিলাম। তিনি বলনেন, না পলাশ, আমি একটা সিগারেট ছাড়া কারো হাত দেখি না। আমি বললাম, আগে দেখুন তারপর সিগারেট আনবো। তিনি বললেন না, আগে সিগারেট আনো, কয়েকটা সুখটান দেই তারপর তোমার ভবিষ্যৎ বলে দিবো।
একপ্রকার বাধ্য হয়ে আগে একটা বেনসন সিগারেট এনে দিলাম। জসিম মেহেদী ভাইয়ের দোকানে বসেই সিগারের ফিল্টারে সুখটান দিলেন। এক জীবনে সিগারেটকে এতে মনোযোগ দিয়ে কাউকে ফুকতে দেখিনি। একেকটি চুমু দিচ্ছেন পরম যত্নে। সিগারেট খাওয়া শেষে বললো, দাও হাত দাও। আমি ডান না যেন বাম হাত বাড়িয়ে দিলাম। তিনি ঠিক অন্য হাত টেনে নিয়ে আমার ভবিষ্যৎ বলে দিলেন। প্রায় দেড়দশক আগের দেয়ার তাঁর ভবিষ্যৎ বাণী কড়াগন্ডায় মিলে গেলো। এরপর ভাইয়ের সাথে অজস্র স্মৃতি। তবে একটা সিগারেট চাইতেন অবলিলায়। কোনো দ্বিধা সংকোচ ব্যাতিত। একসময় তিনি অসুস্থ হলেন। তারপর থেকে সিগারেট চাইলে বলতাম, ভাই আমি আপনাকে অনেক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসি। এমন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষের ক্ষতি আমি চাইতে পারি না। সুতরাং সিগারেট নয় অন্য কি খাবেন বলেন। কিন্তু অন্য কিছু খাবেন না। আমি নাছোড় বান্দা, আমি ঠিক অন্য কিছুই খাওয়াবে। বাধ্য হয়ে সর্বোচ্চ এককাপ চা গিলে সিগারেট বায়নাটা আরো তীব্র হতো। সবশেষ সে চাওয়া পুরণ করতাম। তবে একটি নয় একাধিক দিয়ে।
আজ বাবলু ভাই নেই, ভাবতেই মন কালোমেঘে ভারি হয়ে উঠে। আরো কখনো দেখা হবে না ভাবতেই চোখের কোনো জল নেমে আসে। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে এমনভাবে জড়িয়ে থাকেন, যাঁদের উপস্থিতি শুধু একজন আত্মীয়, বন্ধু বা পরিচিত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁরা হয়ে ওঠেন আমাদের সাহস, প্রেরণা, পথপ্রদর্শক এবং আশ্রয়ের জায়গা। আমার কাছে মাহবুব আনোয়ার বাবলু ভাই ছিলেন ঠিক তেমনই একজন মানুষ।
আমি শ্রদ্ধাভরে তাঁকে বলতাম আমার ভাগ্যরেখার গণক। কারণ তিনি কখনো জ্যোতিষশাস্ত্রের ভাষায় নয়, বরং মানুষের মেধা, পরিশ্রম, সম্ভাবনা ও আত্মবিশ্বাস দেখে ভবিষ্যতের কথা বলতেন। আমার জীবনের নানা বাঁকে তিনি আমাকে সাহস দিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন এবং বিশ্বাস করিয়েছেন একদিন আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। তাঁর প্রতিটি কথায় ছিল আন্তরিকতা, প্রতিটি পরামর্শে ছিল অভিজ্ঞতার আলো।
বাবলু ভাই ছিলেন একজন সৃজনশীল মানুষ। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর। তাঁর সঙ্গে প্রতিটি আলাপ নতুন কিছু ভাবতে শিখিয়েছে, নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। তিনি মানুষকে নিরাশ করতেন না; বরং ভেঙে পড়া মানুষকে নতুন করে দাঁড়ানোর শক্তি দিতেন। তাঁর হাসিমাখা মুখ, আন্তরিক ব্যবহার এবং প্রাণবন্ত কথাগুলো আজও কানে ভাসে।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, এ সত্য মেনে নেয়া খুব কঠিন। তাঁর চলে যাওয়া শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, তাঁর অসংখ্য শুভাকাক্সক্ষী, বন্ধু, সহকর্মী এবং স্নেহধন্য মানুষের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ব্যক্তিগতভাবে আমি হারিয়েছি এমন একজন মানুষকে, যিনি আমার স্বপ্নে বিশ্বাস করতেন, আমার সামর্থ্যকে মূল্য দিতেন এবং সবসময় ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।
আল্লাহর কাছে আমার একান্ত প্রার্থনা, তিনি যেন মাহবুব আনোয়ার বাবলু ভাইয়ের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। তাঁর পরিবারকে এই শোক সহ্য করার ধৈর্য ও শক্তি দান করুন। আমিন।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর ভালোবাসা, প্রেরণা আর রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো কখনো হারিয়ে যায় না। মাহবুব আনোয়ার বাবলু ভাই আমাদের হৃদয়ে সেভাবেই বেঁচে থাকবেন—শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে।


