স্টাফ রিপোর্টার, ফরিদগঞ্জ :
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমে আলোচনার আরেক নাম রাসেল’স ভাইপার, যা বিষধর এক সাপের নাম, কামড়ালে নিশ্চিত মৃত্যু, গ্রাম-গঞ্জে আনাচে কানাচে এনিয়ে চড়িয়েছে আতঙ্ক। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব খুললেই সামনে বেশে উঠে এনিয়ে আলোচনা আর সমালোচনা। আলোচনার কমতি নেই পত্র-পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলেও। তাই আলোচিত এই বিষয়টি নিয়ে নিজ ফেসবুক ফেইজে একটি পোস্ট করেন ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান জুয়েল।
তিনি পোস্টে লিখেন, রাসেল’স ভাইপার কামড়ালেই মৃত্যু নয়, রাসেল’স ভাইপার সাপের বিষের এন্টিভেনম বাংলাদেশেই আছে এবং এই এন্টিভেনম বর্তমানে বাংলাদেশের সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও আছে। সম্প্রতি রাসেল ভাইপার নিয়ে জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় এই বার্তা। বার্তাটি সবাইকে একটু ধৈর্য সহকারে পড়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ করেন তিনি।
সুপ্রিয় ফরিদগঞ্জবাসী আসসালামু ওয়ালাইকুম, আমি ডা. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান জুয়েল, আপনাদের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বলছি…
সারা বাংলাদেশের ন্যায় আমাদের ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পর্যাপ্ত পরিমাণে এন্টিভেনম মজুদ আছে। আমাদের বাংলাদেশের প্রাপ্ত অ্যান্টিভেনমটি ইন্ডিয়ার ঠরঘঝ ল্যাবরেটরিস কর্তৃক প্রস্তুতকৃত, যা মূলত চার ধরনের সাপ যথা খৈয়া গোখরা, রাসেল’স ভাইপার, কালাচ বা পড়সসড়হ শৎধরঃ এবং স স্ক্যালড ভাইপার (বাংলাদেশে পাওয়া যায় না) এর বিষ নিষ্ক্রিয় করার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত। গবেষণায় দেখা যায়, সাপের কামড়ের ১ ঘন্টার মধ্যে এন্টিভেনমটি প্রয়োগ করা হলে প্রায় ১০০℅ সফলতা অর্জন করা যায়, এছাড়া ৪ ঘন্টার মধ্যেও যদি দেয়া হয় তাহলে ৯৫% বা তার বেশি সফলতা পাওয়া যায়। যত বেশি দেরি হবে ততই ঝুঁকি বেড়ে যায়, তাই কোনভাবে কেউ যদি রাসেল ভাইপারের কামড়ের শিকার হন যথাদ্রুত সম্ভব নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা সদর হাসপাতাল বা অন্যান্য সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে (উপজেলা বা তদুর্ধ্ব পর্যায়ের) চলে আসবেন।
১। রাসেল’স ভাইপার নিয়ে বেশ কিছু বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচলিত আছে, যেমন এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিষধর সাপ বা এটি খুব হিংস্র বা আগ্রাসী, এর কামড়ে মৃত্যু আবশ্যক।
একটি সাপের কামড় মরনঘাতি কিনা তা কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে, যেমন এর বিষের শক্তি, সাপটি কতটা আগ্রাসী, সাপটি কি নিজেকে রক্ষা করার জন্য কামড় দিয়েছে নাকি শিকারের উদ্দেশ্যে কামড় দিয়েছে, এটি কামড় দেয়ার সময় বিষ প্রয়োগ করেছে কিনা, করলে প্রয়োগকৃত বিষের পরিমাণ কতটুকু ছিল ইত্যাদি। বিষের শক্তি হিসেবে, রাসেল’স ভাইপার সারা বিশ্বের তো নয়ই এমনকি বাংলাদেশেরও সবচেয়ে বিষাক্ত সাপ নয়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে দেখা পাওয়া সবচেয়ে বিষাক্ত সাপ ইয়েলো বেলিড সি স্নেক (ণবষষড়ি নবষষরবফ ংবধ ংহধশব)। পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত সাপ হিসেবে গণ্য করা হয় ইনল্যান্ড তাইপান (ওহষধহফ ঞধরঢ়ধহ) কে, যা শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়।
২। আগ্রাসনের দিক থেকে তুলনা করলে রাসেল ভাইপার সারা বিশ্বের তো নয়ই এমনকি বাংলাদেশের ও সবচেয়ে আগ্রাসী সাপ নয়। সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আগ্রাসী হিসেবে পরিচিত ব্ল্যাক মাম্বা সাপ, যা আফ্রিকায় পাওয়া যায়।
৩। রাসেল ভাইপার এমনকি বাংলাদেশে দেখা পাওয়া গোখরা সাপের চেয়েও কম আগ্রাসী। গবেষণায় দেখা যায় যে, নরমাল সময় শিকার করার প্রয়োজনে অন্য প্রাণীকে কামড় দিয়ে যে পরিমাণ বিষ প্রয়োগ করে, সাপ যখন নিজেকে আক্রান্ত ভাবে এবং নিজেকে রক্ষা করার জন্য কামড় দেয় তখন সে প্রায় এরচেয়ে ৮.৫-১০ গুণ বেশি বিষ প্রয়োগ করে।
৪। তবে রাসেল ভাইপারের একটি ভয়ঙ্কর দিক হলো এর দাঁতের গঠন প্রকৃতি খুবই অ্যাডভান্সড এবং খুবই সূক্ষ্মভাবে বিষ প্রয়োগের কাজ করতে সক্ষম, যার জন্য এই সাপ যখনই কাউকে কামড় দেয় আমাদের ধরেই নিতে হবে ওই লোক বিষাক্রান্ত হয়েছে। কাজেই, কেউ যদি রাসেল ভাইপারের কামড়ের শিকার হন, তিনি অতি অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতালে চলে আসবেন।
পরবর্তীতে রাসেল ভাইপার বা অন্যান্য বিষাক্ত সাপের কামড়ের প্রাথমিক করণীয় এবং রাসেল’স ভাইপারের বিষের প্রকৃতি সহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খুব দ্রুতই অন্য একটি পোস্টে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
বিঃদ্রঃ আমার এই লেখাটি ফরিদগঞ্জ এর পাশাপাশি মতলব উত্তর এর জনগণের প্রতিও উৎসর্গকৃত, কারণ কিছুদিন আগ পর্যন্তও আমি সেখানে কর্মরত ছিলাম, তাছাড়া চাঁদপুরের মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রাসেল’স ভাইপার দেখা গেছে মতলব উত্তরে। উল্লেখ্য: চাঁদপুর এর সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপে কাটার এন্টিভেনম আছে।


