ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে চাঁদপুর জেলা পরিষদের কোটি কোটি টাকা

স্টাফ রিপোর্টার

চাঁদপুর জেলা পরিষদের কোটি কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নিরাপদ ও সরকারি ব্যাংকগুলোকে উপেক্ষা করে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে না পারা দেশের একাধিক চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও তারল্য সংকটে থাকা বেসরকারি ব্যাংকে জেলা পরিষদের বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা রাখা হয়েছে। সাধারণ গ্রাহকরা যেখানে এসব ব্যাংক থেকে নিজেদের সঞ্চয় তুলতে পারছেন না, সেখানে জেলা পরিষদের এই বিশাল অঙ্কের আমানত কীভাবে উদ্ধার বা উত্তোলন করা হবে—তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁদপুরে জেলা পরিষদের ২৮ কোটি ৫০ লাখ ৩০হাজার ৯শ ৮৫ টাকা দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে জমা আছে।তবে আমানতের সিংহভাগ টাকাই রাখা হয়েছে দেশের তালিকাভুক্ত কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে। সরকারি ব্যাংকে নামমাত্র কিছু টাকা রাখা হলেও বড় অঙ্কের ফান্ড চলে গেছে বেসরকারি খাতে। জেলা পরিষদ চাঁদপুর অঞ্চলের ১৮টি ব্যাংকে আমানত রাখলেও এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ব্যাংকগুলোতে জমার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুর জেলা পরিষদের স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) একটি বড় অংশ নিম্নলিখিত ব্যাংকগুলোতে আটকে রয়েছে। দি সিটি ব্যাংক: ৪ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা (৪৬,০০০,০০০.০০ টাকা)। দি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিঃ ৩ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা (৩৯,০০০,০০০.০০ টাকা)। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি): ২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা (২৪,০০০,০০০.০০ টাকা)। পদ্মা ব্যাংক লিমিটেড (সাবেক দি ফার্স্টমার্স ব্যাংক): ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা (১৭,০০০,০০০.০০ টাকা)। এবি ব্যাংক লিমিটেড: ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা (১৫,০০০,০০০.০০ টাকা)। এসবিএল সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক: ১ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা (১৪,৫০০,০০০.০০ টাকা)। যমুনা ব্যাংক লিমিটেড: ১ কোটি ২৫ লক্ষ ৩০ হাজার ৯৮৫ টাকা (১২,৫৩০,৯৮৫.০০ টাকা)। ন্যাশনাল ব্যাংক: ২৫ লক্ষ টাকা (২,৫০০,০০০.০০ টাকা)। ব্যাংক এশিয়া ২০ লক্ষ টাকা (২,০০০,০০০.০০ টাকা)। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ: ২০ লক্ষ টাকা (২,০০০,০০০.০০ টাকা)। উত্তরা ব্যাংকে ১৫ লক্ষ টাকা (১,৫০০,০০০.০০ টাকা)। এ ছাড়াও আরও একাধিক দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে জেলা পরিষদের বড় অঙ্কের আমানত রয়েছে বলে জানা গেছে।

এছাড়াও ঝুঁকিমুক্ত কয়েকটি ব্যাংকেও রয়েছে জেলা পরিষদের টাকা। যদিও সেসব টাকা উত্তোলন নিয়ে কোন প্রকার ঝুঁকি বা আশংকা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ঝুঁকিমুক্ত ব্যাংকগুলো হলো: অগ্রণী ব্যাংক: ৩ কোটি ৭০ লাখ, সোলানী ব্যাংক: ২০ লাখ টাকা, কৃষি ব্যাংক: ৩০ লাখ, রূপালী ব্যাংক: ২০ লাখ। জনতা ব্যাংক: ২০ লাখ, পূবালী ব্যাংক: ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা, বেসরাকির সিটি ব্যাংক ঝুঁকিমুক্ত বলেও জানা গেছে।

বর্তমান জেলা পরিষদের পরিচালনা পর্ষদ এই সংকট অনুধাবন করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলো থেকে টাকা উত্তোলন এবং তা রাষ্ট্রায়ত্ত কিংবা স্বায়ত্তশাসিত নিরাপদ ব্যাংকগুলোতে স্থানান্তরের জন্য কার্যকর ভূমিকা নেয়ার চেষ্টা করছে। তবে আমানতকারী ব্যাংকগুলোর চরম তারল্য সংকট এবং টাকা ফেরত দেয়ার অক্ষমতার কারণে এখনো পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। ফলে জেলা পরিষদের এই বিশাল পরিমাণ সরকারি অর্থ সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন চাঁদপুর জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক একেএম সলিম উল্যা সেলিম। তিনি বলেন, সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের টাকাগুলো সরকার কর্তৃক পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে আমানত রেখে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি ও বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু তা না করে কেন এবং কাদের স্বার্থে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ চরম ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি ব্যাংকে এফডিআর করা হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি আরও জানান, এই টাকাগুলো নিরাপদে ফিরিয়ে এনে সরকারি ব্যাংকে স্থানান্তরের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সরকারি এই বিশাল তহবিল কোন নিয়মে বা কার ইশারায় ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে রাখা হয়েছিল, তার সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত। একই সাথে এই টাকাগুলো দ্রুত উদ্ধার করে জেলার উন্নয়নমূলক কাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন চাদঁপুরের সাধারণ নাগরিকরা।