স্টাফ রিপোর্টার :
চাঁদপুরের বিস্তীর্ণ পদ্মা-মেঘনা ও ধনাগোদা নদী থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। স্থানীয় কিছু বালুখেকোর সাথে আঁতাত করে দেদারছে বালু কেটে নিয়ে যাচ্ছে মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা একটি বালুচোর চক্র। রাতের আঁধারে প্রায় প্রতিদিন অসংখ্য ড্রেজার মেশিনে বালি উত্তোলন করে ভোরের আলো ফোটার আগেই সেসব বালি অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চাঁদপুর ও মুন্সিগঞ্জের সীমান্তবর্তি এলাকা হওয়ায় খুব দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন।
মুন্সিগঞ্জের বালু খেকো তথা বালু কারবারি জনৈক কিবরিয়ার নেতৃত্বে বালিদস্যু একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই বালিসন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। চতুর এ অসাধু চক্র রয়েছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। অপরিকল্পিতভাবে একপ্রকার চুরি করে বিপুল পরিমাণ বালি উত্তোলনের ফলে ঝুঁকির মুখে রয়েছে নদী তীরবর্তী বিশাল এলাকা।
এসব নদীতে দীর্ঘদিন যাবৎ অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের কারণে ষাটনল, কালিপুর, মোহনপুর, এখলাশপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকার নদীতীর ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। অবৈধ বালি উত্তোলনের কারণে ইতিমধ্যে কালিপুর বাজার, খাগুরিয়া, হাপানিয়া, নবীপুরসহ পাশ্ববর্তী কয়েকটি এলাকায় ধনাগোদা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এই ভাঙ্গনের ফলে হুমকির মুখে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প, কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, হাসপাতাল, মসজিদ-মাদ্রাসা, বসতবাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা। স্থানীয় লোকজনও আতঙ্কে দিন-রাত কাটাচ্ছে।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ষাটনল সংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে ধনাগোদা নদীর প্রবেশমুখের চরকালিপুরা ও ষোলআনী এলাকায় মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বালি উত্তোলনের জন্য ইজারা দিচ্ছে। যা মতলব উত্তরের সীমান্তবর্তী ষাটনল, কালিপুর, বেলতলীসহ বেশ কিছু অঞ্চলে নদী ভাঙনের ক্ষেত্রে আরো বেশি হুমকির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে বলে জানান ষাটনল ও কালিপুর অঞ্চলের জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
অবৈধ বালি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে মাঝেমাঝে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশ অভিযান করে। এসব অভিযানে ড্রেজার, বাল্কহেড, স্পিডবোটসহ বালি উত্তোলনে ব্যবহৃত বিভিন্ন নৌযান ও যন্ত্রপাতি জব্দ করা হয়। আটক করা হয় বালি উত্তোলনে জড়িত শ্রমিকদের। কিন্তু মূল বালিদস্যুরা থেকে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
নিয়মিত অভিযান না হওয়ায় মুন্সিগঞ্জ থেকে প্রায় প্রতি রাতে বালি ব্যবসায়ী কিবরিয়ার লোকজন এসে চাঁদপুরের পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদী থেকে নিজেদের ইচ্ছেমতো বালি উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছে। ওই চক্রটির সাথে মতলব উত্তরের কিছু অসাধু ব্যক্তিও জড়িত রয়েছে। এতে একদিকে যেমন নদী ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে অন্যদিকে সরকার বিপুল রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ ৩০-৪০টি ড্রেজার দিয়ে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। মাঝেমাঝে দিনেও বালি উত্তোলন করতে দেখা যায়। বালি উত্তোলনকারীরা সশস্ত্র অবস্থায় থাকায় তাদরে বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস পায় না স্থানীয়রা। নৌ-পুলিশের জেলা-থানার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বালি উত্তোলনকারীদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা গ্রহণের গুঞ্জন রয়েছে। নৌ-পুলিশের শৈথিল্য নিয়েও নানা গুঞ্জন স্থানীয়দের মধ্যে। অথচ এই এলাকায় কয়েক দফায় বালু খেকোদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। মারা গেছে বেশ কয়েকজন।
স্থানীয়রা আরো জানায় , পদ্মা, মেঘনা, ডাকাতিয়া নদীর মতলব উত্তর অঞ্চলে অবৈধ বালি উত্তোলনের আধিপত্যকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত বহু সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটেছে। এখনো সশস্ত্র অবস্থায় নদী থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের নিয়মিত সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বালি উত্তোলনে জড়িত কিবরিয়া ও তার চক্রের সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি স্থানীয়দের।
ষাটনল ইউপি চেয়ারম্যান ফেরদাউস আলম জানান, এই ধনাগোদা নদীতে অবৈধ বালি উত্তোলনের কারণে ষাটনল ইউনিয়নের ষাটনল, কালিপুরসহ কয়েকটি অঞ্চল ব্যাপক নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরো কঠোর অভিযান প্রয়োজন।
মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলীর মো. সেলিম শাহেদ বলেন, ধনাগোদা নদীর কালিপুর, খাগুরিয়া, হাপানিয়া, নবীপুরসহ কয়েকটি অঞ্চলে ভাঙন দেখা দিলে আমরা তাৎক্ষণিক প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেই। তবে নদীর তীর ও সেচ প্রকল্প বাঁধ রক্ষায় ধনাগোদা নদীতে অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধের বিষয়ে আমরা সহসাই লিখিত অভিযোগ জানাবো।
চাঁদপুরের নদ-নদী থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন বিশেষ করে মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা চক্রের বালি উত্তোলন নিয়ে গত ১৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় ব্যাপক আলোচনা হয়। সভার সভাপতি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন অবৈধ বালি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা প্রদান করেন। সভায় উপস্থিত নৌ-পুলিশের চাঁদপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার অবৈধ বালি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেন। এ ধরণের অভিযানে বাড়তি পুলিশ সদস্যের প্রয়োজন হলে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ নিয়োজিত করার কথা জানান চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব।


