এইচএম জাকির :
বাংলাদেশে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল বা ইপিজেড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় গড়ে ওঠা ইপিজেডগুলো স্থানীয় অর্থনীতিকে যেমন শক্তিশালী করেছে, তেমনি হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করেছে। নদীবিধৌত ও সম্ভাবনাময় জেলা চাঁদপুরে দীর্ঘদিন ধরে একটি ইপিজেড স্থাপনের দাবি উঠছে। গত ১৬ মে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চাঁদপুর সফরে এসে চাঁদপুরে ইপিজেড স্থাপনের আশ্বাস দিয়েছেন এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার জন্যে বিডা চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় চাঁদপুর ইপিজেড-এর সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করতে চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়ন অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত স্থান নির্বাচনের জন্য মাত্র দুই দিনের মাথায় বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (বেপজা) কর্তৃপক্ষ ৩০ দিনের সময় নির্দিষ্ট করে দিয়ে ১৮ মে ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করে।
ইপিজেড স্থাপনের জন্য কেবল জমি থাকাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপদ নৌপথ, প্রশস্ত সড়ক, ঝুঁকিমুক্ত পরিবহন এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের উপযোগী পরিবেশ। এই বিবেচনায় চাঁদপুর শহরের দক্ষিণাঞ্চলের তুলনায় উত্তরাংশ—বিশেষ করে তরপুরচন্ডী, কল্যাণপুর ও বিষ্ণপুর ইউনিয়ন—ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগতভাবে অধিক উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিকল্প হিসেবে শহরের অভ্যন্তরে ডাকাতিয়ার পাড়ে অবস্থিত পরিত্যক্ত পাটশিল্পের ‘ডব্লিউ রাহমান জুট মিলস্ লিঃ’ ও ‘ষ্টার আলকায়েদ জুট মিলস্ লিঃ এর সম্পত্তিগুলো এবং মিলসের পূর্বাংশের ডাকাতিয়ার তীরস্থ চর এলাকাও পরিকল্পনার আওতায় এনে একটি সমন্বিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব।
চাঁদপুর নদীকেন্দ্রিক একটি জেলা। পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থল হওয়ায় এ অঞ্চলের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরে নদীপথ নির্ভর। একটি ইপিজেড স্থাপনের ক্ষেত্রে নদীপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে কার্গো জাহাজ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপদ ও স্বল্পঝুঁকির নৌপথ একটি বড় সুবিধা।
চাঁদপুর শহরের দক্ষিণাংশে লক্ষীপুর ইউনিয়নকে সম্ভাব্য ইপিজেড এলাকা হিসেবে অনেকে বিবেচনা করলেও বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। প্রথমত, ঐ অঞ্চলে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হিসেবে যে পথটি রয়েছে, সেটি কার্যত একটি বেড়িবাঁধ। এটি কোনো আধুনিক শিল্পাঞ্চলের উপযোগী প্রশস্ত সড়ক নয়। বড় আকারের পণ্যবাহী ট্রাক বা কার্গো পরিবহন সেখানে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে না। দুটি ভারী যানবাহনের ওভারটেক তো দূরের কথা, নিরাপদে চলাচল করাও কঠিন। শিল্পাঞ্চলের জন্য প্রতিদিন শত শত ট্রাক চলাচলের প্রয়োজন হয়। সংকীর্ণ ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা ভবিষ্যতে বড় ধরনের যানজট ও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
এছাড়াও পুরানবাজার হয়ে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে সরাসরি উন্নত সড়ক যোগাযোগ এখনো গড়ে ওঠেনি। সাধারণ মোটরসাইকেল আরোহীদেরও চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সেখানে শিল্পায়নের মতো বৃহৎ অবকাঠামোগত কার্যক্রম পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত নয়। একটি ইপিজেডের জন্য কেবল বর্তমান অবস্থা নয়, আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হয়। দক্ষিণাঞ্চলের বর্তমান অবকাঠামো সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নৌপথের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদপুর শহরের দক্ষিণাংশে পদ্মা ও মেঘনার মিলনস্থলের উত্তাল ঢেউ প্রায়ই বড় ঝুঁকির সৃষ্টি করে। বর্ষাকালে এ অঞ্চলের নদী ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। বড় বড় লঞ্চ পর্যন্ত দুলতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে শিল্পপণ্য বহনকারী কার্গো জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। দুর্ঘটনা বা জাহাজডুবির আশঙ্কা থাকলে বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ হারাতে পারেন। কারণ একটি ইপিজেডের মূল ভিত্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ সরবরাহ ব্যবস্থা।
অন্যদিকে চাঁদপুর শহরের উত্তরাংশ ভৌগোলিকভাবে অনেক বেশি সুবিধাজনক। তরপুরচন্ডী, কল্যাণপুর ও বিষ্ণপুর ইউনিয়ন সরাসরি মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত। কিন্তু এ অঞ্চলে নদীর স্রোত তুলনামূলক শান্ত এবং পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত। ফলে নৌপথে কার্গো পরিবহন অনেক বেশি নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত। শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি কিংবা রপ্তানি পণ্য পরিবহনে এটি বড় ধরনের সুবিধা এনে দিতে পারে।
সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও উত্তরাঞ্চল অনেক এগিয়ে। এখানে জিটি রোড ও বিটি রোড—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক রয়েছে, যা সহজেই কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত। বিশেষ করে বিটি রোড প্রশস্ত ও ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী। একটি আধুনিক ইপিজেডের জন্য এই ধরনের প্রশস্ত সড়ক অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন কনটেইনার ট্রাক, ভারী যন্ত্রপাতি ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করবে। সংকীর্ণ রাস্তা সেখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ। চাঁদপুর শহরের উত্তরাঞ্চল থেকে সড়ক পথে মতলব হয়ে ঢাকায় যেতে সময় কম লাগে। ভবিষ্যতে যদি আরও উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে ওঠে, তবে এই অঞ্চল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প করিডোরে পরিণত হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন স্থান পছন্দ করেন যেখানে রাজধানী ও সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব। সেই বিবেচনায়ও উত্তরাংশ অধিক সম্ভাবনাময়।
ইপিজেড স্থাপনের মাধ্যমে চাঁদপুরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। তবে ভুল স্থানে শিল্পাঞ্চল গড়ে তুললে ভবিষ্যতে কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো সংকটে পড়তে পারে। তাই আবেগ নয়, বাস্তবতা ও ভৌগোলিক উপযোগিতাকেই প্রাধান্য দেওয়া জরুরি।
চাঁদপুরের উত্তরাঞ্চলে ইপিজেড স্থাপন করা গেলে নদীপথ, সড়কপথ ও আঞ্চলিক যোগাযোগ—সবদিক থেকেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিল্প পরিবেশ গড়ে উঠবে। একইসঙ্গে শহরের উপর অতিরিক্ত চাপও কমবে। পরিকল্পিত শিল্পায়নের মাধ্যমে এই অঞ্চলকে আধুনিক অর্থনৈতিক জোনে রূপান্তর করা সম্ভব।
সবমিলিয়ে বলা যায়, চাঁদপুরে ইপিজেড স্থাপনের ক্ষেত্রে শহরের দক্ষিণাংশের তুলনায় উত্তরাংশই অধিক উপযুক্ত ও ভবিষ্যতমুখী সিদ্ধান্ত হতে পারে। মেঘনা নদী ঘেঁষা তরপুরচন্ডী, কল্যাণপুর ও বিষ্ণপুর ইউনিয়নের ভৌগোলিক অবস্থান, নিরাপদ নদীপথ, প্রশস্ত সড়ক যোগাযোগ এবং ঢাকার সঙ্গে সহজ সংযোগ—সবকিছু মিলিয়ে এই অঞ্চল শিল্পায়নের জন্য একটি কার্যকর ও টেকসই সম্ভাবনাময় স্থান। পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে একদিন চাঁদপুরও দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।


