৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মাধ্যমে দেশে পুরনো ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগকে পতন করে ছাত্র-জনতা। এ পতনে দেশের মানুষ এক ঐতিহাসিক ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে থাকে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কার্যত তিন দিন দেশ সরকারশূন্য থাকার পর ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে।
দীর্ঘদিন চলমান দুর্নীতি, বৈষম্য, সুশাসনহীন এ দেশকে সংস্কারের আহ্বান জানান আমজনতা। জনগণের এই আশা আকাক্সক্ষাকে বাস্তবে রুপ দিতে প্রধান উপদেষ্টা পদে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ১৩টি উপদেষ্টা পদে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের নির্বাহী পরিচালক আদিলুর রহমান খান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব তৌহিদ হোসেন, পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন, নারী অধিকারকর্মী ফরিদা আখতার, ইসলামি চিন্তাবিদ আ ফ ম খালিদ হাসান, গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর জাহান বেগম ও নির্বাচনব্যবস্থা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ শারমিন মুরশিদ শপথ নিয়েছেন। সূচিত হয়েছে দেশ শাসন করার নতুন যাত্রা। আমরা জনগণরা নতুন এই সরকারের কাছে যা প্রত্যাশা করি।
নিরাপদ সড়ক : আমরা সকলেই জানি দেশে বছরে বহু মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছে। এ দুর্ঘটনা অনেকে ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিলেও মূলত দেশে নানাবিধ সমস্যা রয়েছে, যার কারনে দুর্ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। সড়কের পিচ রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না সড়ক দুর্ঘটনা। সাধারণত যে সব কারনে দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। যেমন- ১. মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও তিন চাকার যানের ব্যাপক বৃদ্ধি। ২. মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে অবাধে চলাচলা করা ও ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা। ৩. সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন। ৪. অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়াভাবে দ্রুতগতিতে যানবাহন চালানো। ৫. রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বরত ব্যক্তির গাফিলতি। ৬. ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে সতর্ক না থাকা এবং লাইসেন্স প্রদানের পূর্বে চালকদের সঠিকভাবে পরীক্ষা না নেওয়া ৭. সড়কে বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি। তাই নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে সড়কের বিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে দুর্ঘটনা রোধে যথাযথ কার্যকর ভূমিকা যেন রাখে।
শিক্ষা : জাতীয় অধ্যাপক, বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক আনিসুজ্জামান বলেছেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থাটা হওয়া উচিত পিরামিডের মতো। এর ভিত্তিটা চওড়া হবে। উচ্চশিক্ষা হবে তার চূড়া। সকলে যাতে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করতে পারে, সর্বাগ্রে তা দেখা দরকার। আমি আসলে অন্য কথা বলতে চেয়েছিলাম। আমাদের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, শিক্ষা বিস্তারের জন্য তা আবশ্যক, কিন্তু এ ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির সঙ্গে তাল রেখে উপযুক্ত শিক্ষা পাওয়া যায় না। ফলে শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষত বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রার্থিত মানে উন্নীত হতে পারছে না। তারা যখন শিক্ষার তৃতীয় স্তরে অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তখন এই দুর্বলতা আর দূর করে ওঠার সম্ভাবনা থাকে না।’
‘পৃথিবীতে জ্ঞানের যে বিস্ফোরণ ঘটছে, তা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ফলে আমাদের লব্ধ জ্ঞানের অনেকটাই প্রতিনিয়ত বাতিল হয়ে যাচ্ছে। সেখানে নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি হচ্ছে। জ্ঞানের সৃষ্টিতে আমরা তেমন অগ্রসর হতে পারিনি। তবে যে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হচ্ছে তা আয়ত্ত করতে আমরা চেষ্টা করছি। সে প্রয়াস তীব্র না হলে আমাদের শিক্ষার্থীরা সত্যি সত্যি পিছিয়ে পড়বে। ’
আর এই তীব্রতা তৈরিতে প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢালাওভাবে সাজানো। বর্তমান সরকারের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সবার গ্রহণযোগ্য হিসেবে তৈরি করা।
দুর্নীতি কমিয়ে আনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা : বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠনে দুর্নীতি প্রধান অন্তরায়। যেসব দেশে সম্পদের অপ্রতুলতা রয়েছে, সেখানে দুর্নীতি রয়েছে। দুর্নীতি এমন এক অপরাধ যা অন্যান্য অপরাধ দমনেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অধিকাংশ অপরাধের অন্যতম উৎস হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতগ্রস্ত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল দুর্নীতিকে সহনশীল মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। সুশাসন ছাড়াও দেশ উন্নত হয় না। তাই এখানেও প্রত্যাশা থাকবে দুর্নীতি কমিয়ে আনবে সরকার এবং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করা : মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে স্বাস্থ্য অন্যতম। সুস্বাস্থ্য ছাড়া দেশ গঠন করা যায় না। আমাদের দেশে বিশেষ করে চাঁদপুরে ব্যঙের ছাতার মতো ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে প্রাইভেট হাসপাতাল। এগুলো তাদের নিজের ইচ্ছামতন চলছে। বিল করছে নিজেদের ইচ্ছেমতনই। সেবার মানের ব্যাপারে রোগীদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। অথচ মোটা অংকের বিল হাতিয়ে নিচ্ছে পরিপূর্ণ সেবা ছাড়াই। যার ফলে রোগীরা অথনৈতিকভাবে সমস্যাগ্রস্ত হচ্ছে, সুচিকিৎসা না পেয়ে হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। দেশের স্বাস্থ্যখাতের বেহাল দশায় পরিণত হয়ে আছে। আমরা সেটা জানি। তাই নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে একটি সুন্দর স্বাস্থ্য নীতিমালা প্রণয়ন করে সকল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্রাইভেট হাসপিতাল, সরকারি হাসপাতালগুলোকে একটি কেন্দ্রে নিয়ে আসা। যেন রোগীরা পরিপূর্ণ চিকিৎসা সেবা পেতে পারে।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময়ও জনগণ পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান সরকারকে মেনে নিয়েছিল। দারিদ্র, নিপীড়িত, দুর্বল সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ ভেবেছিল এইবার তাদের সকল দু:খের মুক্তির অবসান হতে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তা আর হয়নি। জনগণ দারিদ্রসীমার মধ্যেই আটকে থাকে। এরপর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল বাঙালি জাতির শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। একটি গণতান্ত্রিক, শোষণহীন, বৈষম্যহীন একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের সাথে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে। বিশে^র মাঝে আবির্ভূত হয় বাংলাদেশ নামক নতুন দেশ। কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি। গণতন্ত্র রাষ্ট্র হলেও অগণতন্ত্রই রয়ে গেল, শোষণ আর বৈষম্যেই রয়ে গেল এ সমাজ। দুর্নীতির ছোবলে একশ্রেণির মানুষ লাখপতি থেকে কোটিপতি, আর অন্য শ্রেণির মানুষ দরিদ্র থেকে আরো দরিদ্রে পৌছলো। অর্থনৈতিক মুক্তির চাদের আটকে থাকলো জনতা। তবে ২০২৪ সালে গণআন্দোলনের প্রতিফলন সকল রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গরা বুঝতে পেরেছেন। তারা হয়তো উপলব্ধি করতে পারছেন যে, এই দেশটা পুরোটাই একটি পরিবার। তাই পরিবারের সকলেই যেন ভালো থাকে, তার মানবীয় সকল চাহিদা মিটাতে পারে, সুন্দর, স্বচ্ছভাবে জীবন ধারন করতে পারে, তা নিশ্চিত করা। আশা করছি এবার মানুষ তার বেঁচে থাকার যে স্বপ্ন দেখে আসছিল। তা পূরণে নতুন সরকার তার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবে এবং দেশের সকলের ভাগ্য পরিবর্তন করবে।
লেখক পরিচিতি : মুহাম্মদ আউয়াল হোসাইন পাটোয়ারি (রিটন), লেখক ও প্রাবন্ধিক।


