মৃত্যুফাঁদে মেঘনা-ধনাগোদা ৬৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ

মতলব প্রতিনিধি:

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ সড়ক এখন যেন এক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও টানা বর্ষণের কারণে সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় শতাধিক গর্ত, ছিদ্র ও ধসের সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো মানুষ।

শনিবার (১৩ জুন) ষাটনল থেকে আমিরাবাদ পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টির পানির চাপে মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের মূল বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তত ১০ থেকে ১২টি স্থানে বড় ধরনের ছিদ্র এবং ৪০ থেকে ৫০টি স্থানে ছোট ছোট গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আমিরাবাদ, মোহনপুর, ষাটনল, শিকিরচর, এখলাসপুর, জহিরাবাদ ও জনতাবাজার সংলগ্ন এলাকাগুলো বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিনের বৃষ্টিতে নতুন নতুন গর্ত তৈরি হচ্ছে। অনেক জায়গায় সড়কের পিচ উঠে গিয়ে নিচের মাটি ধসে পড়েছে। কোথাও কোথাও সড়কের একাংশ ঝুলন্ত অবস্থায় থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়েছে কয়েকগুণ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) চাঁদপুর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মতলব উত্তর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নের মানুষকে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩২ হাজার ১১০ একর ফসলি জমি সুরক্ষিত রয়েছে। তবে নির্মাণের পর অন্তত দুবার বাঁধ ভেঙে কয়েকশ কোটি টাকার ফসল, ঘরবাড়ি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বর্তমানে বেড়িবাঁধের ওপর নির্মিত পিচঢালাই সড়কটি মতলব উত্তর উপজেলার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। শুধু মতলব উত্তর নয়, ঢাকা, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার যানবাহনও এ সড়ক ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে জনদুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।

ট্রাকচালক মো. সোহেল মিয়া বলেন, “প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে মালামাল পরিবহন করি। কয়েকটি স্থানে এমন বড় বড় গর্ত হয়েছে যে সামান্য অসাবধান হলেই গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে রাতের বেলায় চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত সংস্কার না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”

সিএনজি অটোরিকশাচালক মো. আল-আমিন বলেন, “দিনে কয়েকবার এই সড়ক দিয়ে যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করি। গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে প্রায়ই বিপদে পড়তে হয়। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও আমরা উদ্বিগ্ন। বর্ষার কারণে গর্তগুলো আরও বড় হচ্ছে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমানে স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে বালুর বস্তা, মাটি ও ইট ফেলে সাময়িক মেরামতের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাধান নয় বলে মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাঁদপুর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী সেলিম সাহেদ বলেন, “বেড়িবাঁধ সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সড়কের গর্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনদুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, “বেড়িবাঁধ সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো দ্রুত মেরামত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে।”