৩৯ বছরের শিক্ষকতা শেষে রাজকীয় বিদায়

স্টাফ রির্পোটার:

দীর্ঘ ৩৮ বছর ৮ মাস ২০ দিনের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ১২৪ নং নন্দলালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুখ রঞ্জন বিশ্বাস। কর্মজীবনের শেষ দিনে সহকর্মী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে পেলেন এক ব্যতিক্রমী ও রাজকীয় বিদায়। ফুলে সজ্জিত একটি প্রাইভেটকারে করে তাঁকে নিজ বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়। এমন আবেগঘন বিদায় অনুষ্ঠানের দৃশ্য স্থানীয়দের মাঝেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

সোমবার (২৯ জুন) বিকেলে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনুষ্ঠানে বিদায়ী প্রধান শিক্ষক সুখ রঞ্জন বিশ্বাসকে ফুলেল শুভেচ্ছা, উত্তরীয় ও সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।

আলোচনা সভায় বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামানের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আনিছুর রহমান, চরপাথালীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী কৃষ্ণ পাল, সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি আব্দুল বাতেন, উপজেলা স্কাউট কমিশনার শাহজাহান, স্কাউট সম্পাদক আক্তার হোসেন, উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশিকুজ্জামান, বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র সুমন খান, ডা. মোহন মিয়া, সহকারী শিক্ষক পারুল রানী বিশ্বাস, সালেহা আক্তার, বিল্লাল হোসেন, হাসনেয়ারা আক্তার, ঝুমুর আক্তারসহ অনেকে।

বক্তারা বলেন, সুখ রঞ্জন বিশ্বাস শুধু একজন দক্ষ প্রধান শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিদ্যালয়ের একজন অভিভাবক, স্নেহশীল পরামর্শদাতা ও আদর্শ মানুষ। তাঁর সততা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা এবং শিক্ষার প্রতি একনিষ্ঠতা বিদ্যালয় ও সমাজে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বক্তব্যে তাদের প্রিয় শিক্ষকের কর্মময় জীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন। অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বিদায়ী বক্তব্যে সুখ রঞ্জন বিশ্বাস শিক্ষকতা জীবনের নানা সুখ-দুঃখের স্মৃতিচারণ করে সহকর্মী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এলাকাবাসীর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠান শেষে ফুল দিয়ে সুসজ্জিত একটি প্রাইভেটকারে করে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। পথজুড়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী হাত নেড়ে এবং ফুল ছিটিয়ে প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানান। বিদায়ের সেই আবেগঘন মুহূর্তে অনেকের চোখেই ছিল অশ্রু। শিক্ষার্থীদের কান্না আর ভালোবাসা যেন প্রমাণ করে, একজন প্রকৃত শিক্ষকের সবচেয়ে বড় অর্জন তাঁর শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেওয়া।

জানা যায়, সুখ রঞ্জন বিশ্বাস ১৯৮৭ সালের ১০ অক্টোবর সাদুল্ল্যাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ১৯৮৮ সালের ১০ অক্টোবর দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ১৯৯৬ সালের ১০ জানুয়ারি নন্দলালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর একই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দীর্ঘ প্রায় ৩৯ বছর নিষ্ঠা, সততা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২৬ সালের ২৯ জুন তিনি অবসরে যান।

ব্যক্তিগত জীবনে সুখ রঞ্জন বিশ্বাস স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক। তাঁর বড় ছেলে একজন ব্যাংকার, মেয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছোট ছেলে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।

দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তিতে পাওয়া এই ব্যতিক্রমী বিদায় শুধু একজন শিক্ষকের প্রতি সম্মান নয়, বরং শিক্ষা, মানবিকতা ও আদর্শের প্রতি সমাজের শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।