রিং চাইয়ে হুমকিতে মেঘনার মাছ

স্টাফ রির্পোটার:

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা ও ধনাগোদা নদীতে দিন দিন বাড়ছে অবৈধ রিং চাই (পাইপের মতো দেখতে মাছ ধরার ফাঁদ) ব্যবহারের প্রবণতা। সহজে বেশি মাছ ধরার আশায় অসাধু জেলেরা নদীর বিভিন্ন স্থানে সারি সারি রিং চাই বসিয়ে নির্বিচারে মাছ শিকার করছেন। এতে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ, মাছের পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ ধ্বংস হচ্ছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা।

সম্প্রতি উপজেলার মেঘনা ও ধনাগোদা নদীপাড়ের দশানী, এখলাসপুর, ষাটনল, আমিরাবাদ, কালীপুর, বেলতলী ও নন্দলালপুর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর বিভিন্ন স্থানে শত শত রিং চাই বসানো হয়েছে। কোথাও জেলেরা পুরোনো চাই মেরামত করছেন, আবার কোথাও নতুন চাই তৈরি করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ ফাঁদ ব্যবহার হলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অভিযান তুলনামূলক কম।

দশানী এলাকার জেলে আল-আমিন বলেন, মাছ ধরাই তাঁর পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। মুন্সীগঞ্জ থেকে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় পুরোনো রিং চাই কিনে এনে নদীতে বসান। সেখান থেকে পাওয়া মাছ বিক্রি করেই সংসার চালান।

বাহাদুরপুর এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে জানান, রিং চাই ব্যবহার যে অবৈধ, তা তারা জানেন। তবে বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে জীবিকার তাগিদেই তারা এ পদ্ধতিতে মাছ ধরতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রশাসনের অভিযানে মাঝেমধ্যে চাই জব্দ হলেও জীবিকার প্রয়োজনেই আবারও নদীতে নামতে হয় বলে জানান তারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই রিং চাইয়ের ব্যবহার কঠোরভাবে বন্ধ করা না গেলে মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা ও ধনাগোদা নদীর দেশীয় মাছের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর প্রভাব শুধু নদীর জীববৈচিত্র্যেই নয়, প্রকৃত জেলেদের জীবন-জীবিকাতেও পড়বে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মফিজুল ইসলাম বলেন, রিং চাই অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি ফাঁদ। এতে একবার মাছ প্রবেশ করলে ছোট-বড় কোনো মাছই বের হতে পারে না। বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে এ ধরনের ফাঁদের ব্যবহার মাছের বংশবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি নদীর বাস্তুতন্ত্রের জন্যও বড় হুমকি।

স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ‘মতলবের মাটি ও মানুষ’-এর পরিচালক শামীম খান বলেন, রিং চাইয়ে শুধু মাছ নয়, কাঁকড়া, শামুক, কচ্ছপসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে মারা যায়। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কঠোর অভিযান এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

বেলতলী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. মুজাম্মেল হক (পিপিএম) বলেন, অবৈধ জাল ও নিষিদ্ধ ফাঁদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। স্থানীয়দের সচেতন করার পাশাপাশি অভিযান আরও জোরদার করা হবে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত মাসেও এ ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী বলেন, মেঘনা নদী ও এর শাখা নদীগুলোর মৎস্যসম্পদ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নৌ পুলিশ সর্বদা তৎপর রয়েছে। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, চায়না রিং চাই জালসহ যেকোনো অবৈধ জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চলবে।

মতলব উত্তর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার দাস বলেন, রিং চাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও অবৈধ। গত মাসেই ১৫টি অভিযানে ৪৮০টির বেশি রিং চাই জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে। তবে অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই আবার নতুন করে এসব ফাঁদ বসানো হচ্ছে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা ছাড়া এ অবৈধ ফাঁদের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।