ভ্রমণ মানে টাকা, ভ্রমণ মানে অপচয়। ভ্রমণ না করে বাসায় বসে কাজ করলে সেটাই হবে বেস্ট কাজ এবং বুদ্ধিমানের কাজ। প্রকৃতপক্ষে এরকম ধারণা পোষণ করা বড়ো ধরনের বোকামি।
মানুষের মনের ক্লান্তি এবং ডিফ্রেশন দূর করতে ভ্রমণ অন্যতম সহায়ক। ভ্রমণ মানুষের মনকে উদার করে, মানুষকে স্বপ্নবাজ বানায়, অজানাকে জানার কিংবা অদেখাকে দেখার কৌতুহল বাড়ায় এবং কাজের গতি ত্বরান্বিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ধর্মীয় দিক থেকে বিবেচনা করলে, ভ্রমণ একটি আনন্দময় ইবাদত। এর মাধ্যমে মানুষ চিন্তাশীল হয় এবং স্রষ্টাকে জানার চেষ্টা করে। মূলত মানুষের জীবনটাই হলো ভ্রমণকাল। আর আমাদের ভ্রমণগুলো ইন্টারিম ভ্রমণ।
বলছি ফরিদগঞ্জ আদর্শ একাডেমীর কথা,যা ফরিদগঞ্জ উপজেলার একটি শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমি উক্ত স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক। মানসিক ক্লান্তি দূর করতে দীর্ঘদিনের নিয়মিত পাঠদান থেকে সাময়িক ছুটি নিয়ে আমরা বের হয়েছি সফরে, শিক্ষা সফরে।
উক্ত প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও শিক্ষাবিদ হারুন অর রশিদ স্যার এবং মাধ্যমিক শাখার ইনচার্জ শাহাদাত হোসেন স্যার সহ অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ নিজ নিজ অবস্থান থেকে খুবই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা ফরিদগঞ্জ আদর্শ একাডেমী ক্যাম্পাস থেকে থেকে যাত্রা শুরু করি বুধবার রাতে (২৬ ফেব্রুয়ারী)। যাত্রাপথে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মাননীয় অধ্যক্ষ মহোদয় দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন এবং নিরাপদ সফরের জন্য আল্লাহর সহযোগিতা কামনা করেন। রাত ১১ টার দিকে যাত্রা শুরু করলেও আমরা কক্সবাজার পৌঁছি সকাল ৮ টার দিকে। হোটেল সী ওয়ার্ল্ডে প্রত্যেকের লাগেজ রাখি এবং নাস্তা সেরে সবাই হেঁটে চলে যাই পৃথিবীর দীর্ঘতম (১২০ কিলোমিটার) বালুময় সমুদ্র সৈকতে অর্থাৎ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে, যা নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের জন্য ভুবন বিখ্যাত।
শুরু হলো আনন্দ, যা সময়ের সাথে সাথে নতুন নতুন মাত্রা পেতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে পর্যটকদের আগমনও বাড়তে থাকে। অন্যান্য পর্যাটকদের মতো কেউ সাঁতার কাটে, কেউ ছবি তোলে। কেউ ঘুরাঘুরি করে। গোসল না করলেও আমিও কিছুটা নেমে পানির স্বাদ চ্যাক করলাম। পানি পান করার অনুপযোগী ছিল। খুবই লবণাক্ত। তবে শিক্ষকবৃন্দের নেতৃত্বে সব কিছুই ছিল সুশৃঙ্খল।
জোহরের নামাজ সেরে লাঞ্চ করে গেলাম নাজিরহাট টেক। সেখানে চলে লাল কাকড়ার রাজত্ব, লাল লাল খেলা। আমাদের পায়ের আওয়াজ পাওয়া মাত্রই তারা গর্তে প্রবেশ করে। আমার মতো সকল শিক্ষকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীবৃন্দও এই নান্দনিক দৃশ্য উপভোগ করার পাশাপাশি ভিডিয়োতে/ছবিতে বন্দী করে। সেখানে শিক্ষার্থী সহ ছুটে গেলাম ইউন্ডমিল দেখতে। বাতাসের বেগ বৃদ্ধির সাথেই বৈদ্যুতিক সংযোগহীন পাখার বেগ বৃদ্ধি পায়। এগুলো নিয়ে অবশ্যই ফিজিক্সে আলোচনা আছে। ফেরার পথে দেখতে পেলাম বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শুঁটকি, যেন সেখানে মেলা বসেছে।তাছাড়া ফেরার পথে দেখেছি দৃষ্টিনন্দন খুরুশকুল সেতু, যে সেতু–সড়কের পাশেই বাঁকখালী নদী আর কয়েকটি জলাভূমি।
যাইহোক, একরাত পার করেই অধ্যক্ষ মহোদয়ের অনুমতি সাপেক্ষে প্রভাষক মহসিন স্যার সহ হাবিবুল্লাহ স্যার, সালেহ স্যার, শিব্বির স্যার, এয়ার স্যার এবং আমি স্টিমারে চড়ে গেলাম মহেষখালী দ্বীপ,যা লবণ ও পান ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র। পান, মাছ, শুঁটকী, চিংড়ি, লবণ এবং মুক্তার উৎপাদন এই উপজেলাটিকে দিয়েছে দেশব্যাপী খ্যাতি।
আমরা লবণ চাষ পদ্ধতি, বৌদ্ধ মন্দির, বৌদ্ধদের লাইফস্টাইল, স্বর্ণ মন্দির, পান চাষীদের জীবনধারা, উপজাতীয়দের তৈরি তাঁতবস্ত্রের দোকান এবং সারি সারি দোকানপাট সবকিছুই দেখেছি। স্বর্ণমন্দিরে প্রবেশ নিষেধ, তাই বাহিরে থেকে দেখেছি। বঙ্গোপসাগর ঘেরা মৈনাক পর্বতের চূড়ায় মনোরম পরিবেশে আদিনাথ মন্দিরের (শিব মন্দির) অবস্থান, কিছুক্ষণ পর ধীরেধীরে ৬৯ টি সিঁড়ি বেয়ে ২৮০ ফিট উচ্চতায় উঠে ফ্রেমবন্দী হই। হাবিবুল্লাহ স্যার উঠতে চায়নি, আমার অনুরোধে উঠেছে। সেখান থেকে নেমেই আমি আগুন পানের খিলি খেলাম ৫০ টাকা দিয়ে। আর ছবি তুলতে কেউই ভুল করিনি। ফেরার পথে সালেহ স্যার আমাদেরকে জিলাপি খাওয়ালেন, কলিজা পর্যন্ত মিষ্টি হয়ে গেল।
অন্যদিকে অধ্যক্ষ হারুন অর রশিদ স্যার, শাহাদাত স্যার, হাসান স্যার, সাদ্দাম স্যার, বরকুতুল্লাহ স্যার, বোরহান স্যার, রফিক স্যার এবং রফিউদ্দিন স্যার গেলেন রামু বৌদ্ধ মন্দির, কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন, রামু রাবার বাগান ইত্যাদি পরিদর্শন করতে। প্রাকৃতিক পলিমার রাবার, আর রামুর রাবার বাগান বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের কাছে এবং সবার কাছে ছিল আকর্ষণীয়। তাছাড়া চান্দের গাড়িতে বসে শিক্ষার্থীদের মুখে ছিল অসাধারণ গান, যা সবাইকে বিমোহিত করে।
একটা কথা ভুলেই গেছি। ভ্রমণ হলেও নামাজ মিস হয়নি, মুসাফিরের সালাত আদায় করেছি। নামাজের সময় হলেই অধ্যক্ষ মহোদয় এবং শাহাদাত স্যার সবাইকে নামাজের জন্য দাওয়াত করতেন এবং মসজিদে নিয়ে যেতেন। উল্টাপাল্টা বিনোদনের প্রশ্নই আসে না।তাছাড়া একটা কথা না বলা ঠিক হবে না। সম্পূর্ণ ভ্রমণে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন ফখরুল স্যার, হোটেল নির্ধারণ সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি এই সফরে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন।
কর্ণফুলী টানেল হয়ে আমরা ফিরে আসি শুক্রবার রাত ১২টার দিকে। অধ্যক্ষ মহোদয় এবং শাহাদাত স্যার দায়িত্ব নিয়ে সবাইকে বাসায় পৌঁছাতে সাহায্য করলেন এবং দূরবর্তী স্থানের শিক্ষার্থীদের স্কুল ক্যাম্পাসে রাত্রিযাপন করতে বললেন। নিজ সন্তান বাসে থাকলেও সবার প্রতি ছিল অধ্যক্ষ মহোদয়ের সমান দেখাশোনা, সত্যিই তিনি আদর্শ একাডেমীর একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক।
ভ্রমণ শেষে সবার মুখে ছিল আনন্দ।শিক্ষার্থীদের মতে,মানসম্মত খাবার পরিবেশন,চমৎকার লোকেশন ভ্রমণ এবং মানসম্মত পরিবেশে রাত্রিযাপন–সবকিছু মিলিয়ে তারা পেয়েছে ফুল প্যাকেজ।
যাইহোক, সবাই যেন দুদিনের জন্য অন্য ভুবনে হারিয়ে গেলো, যা স্মৃতির ক্যানভাসে অমলিন হয়ে থাকবে আজীবন। একসময় হয়তো শিক্ষার্থীরা এই সফর নিয়ে অন্যদের কাছে গল্প করবে। গল্প করতে করতে নস্টালজিক হয়ে যাবে। পাশাপাশি শিক্ষকবৃন্দ, অভিভাবকবৃন্দ এবং সচেতন শিক্ষার্থীদের পরামর্শে ফিউচার ট্যুর আরও উপভোগ্য হবে, ইনশাআল্লাহ। সেটাই প্রত্যাশা করি। সবিশেষ বলতে চাই, আমার মতো নগণ্য মানুষের এই অগোছালো লেখায় ভুল পরিলক্ষিত হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ।
রাসেল ইব্রাহীম
শিক্ষক ও গীতিকবি


