ইরান কেন ও কিভাবে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অগ্রগামী? -মোবারক করিম খান

ভূমিকা

আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের মাপকাঠি। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং সামরিক শক্তি, আন্তর্জাতিক অবস্থান ও স্বনির্ভরতার মূল ভিত্তি। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দেশ ইরান আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের এই অগ্রযাত্রা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে।

১. শিক্ষা ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ

ইরান প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বেছে নিয়েছে।

বর্তমানে ইরানে শত শত বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

UNESCO’র তথ্যমতে, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সর্বাধিক বিজ্ঞানী উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি।

ইঞ্জিনিয়ারিং, চিকিৎসাশাস্ত্র, পদার্থবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ও তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রতি বছর হাজার হাজার গবেষক তৈরি হচ্ছে।

২০১৯ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ইরান বিশ্বের শীর্ষ ১৫টি দেশ-এর মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করে।

২. গবেষণা ও উদ্ভাবনে অগ্রগতি

ইরানের প্রযুক্তি গবেষণা শুধু তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও শক্তিশালী।

ন্যানোটেকনোলজিতে ইরান বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ৫ দেশের মধ্যে অবস্থান করছে।

বায়োটেকনোলজিতে ওষুধ তৈরি, কৃষি গবেষণা ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ইরান দ্রুত এগিয়ে গেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও সাইবার প্রযুক্তিতে ইরান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে।

আন্তর্জাতিক ডাটাবেস অনুযায়ী, ইরান প্রতি বছর কয়েক হাজার পেটেন্ট নিবন্ধন করে, যা তাদের উদ্ভাবনী শক্তিকে প্রতিফলিত করে।

৩. নিষেধাজ্ঞা ও স্বনির্ভরতা

ইরানের ওপর দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান।

এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে উন্নত প্রযুক্তি আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ফলে ইরান নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়নের কৌশল গ্রহণ করে।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, নিষেধাজ্ঞা না থাকলে ইরান হয়তো বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করত, কিন্তু নিষেধাজ্ঞাই তাদের স্বনির্ভর হতে বাধ্য করেছে।

এই চাপের কারণে ইরান স্থানীয় শিল্প, গবেষণা ও উদ্ভাবনে এমনভাবে বিনিয়োগ করেছে যা আজ তাদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতামূলক করেছে।

৪. সামরিক ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি

ইরানের প্রযুক্তি উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র প্রতিরক্ষা।

ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, এবং মহাকাশ গবেষণায় ইরান উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।

ড্রোন প্রযুক্তিতে ইরান আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। তাদের তৈরি ড্রোন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন যুদ্ধে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

সাইবার প্রতিরক্ষায়ও ইরান নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করেছে, যা পশ্চিমা শক্তিকেও চ্যালেঞ্জ করেছে।

৫. সরকারি নীতি ও কৌশল

ইরান সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।

“ভিশন ২০২৫” নামক উন্নয়ন পরিকল্পনায় ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ প্রযুক্তি-শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকার জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি (knowledge-based economy) গঠনের দিকে জোর দিচ্ছে।

স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে।

৬. সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ইরান প্রাচীনকাল থেকেই বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র ও গণিতে অবদান রেখেছে।

ইবনে সিনা, আল-ফারাবি প্রমুখ বিজ্ঞানীরা ইরানি ঐতিহ্যের অংশ।

এই ঐতিহাসিক গৌরব আধুনিক ইরানিদের মধ্যে জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি করেছে।

ফলে আধুনিক ইরানও বৈজ্ঞানিক মানসিকতা ও গবেষণার ধারাকে অব্যাহত রেখেছে।

ইরানের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির গল্প আসলে চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তরের গল্প।
শিক্ষা, গবেষণা, স্বনির্ভরতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সরকারি কৌশলগত পরিকল্পনার কারণে আজ ইরান মধ্যপ্রাচ্যে এক প্রযুক্তি-শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তাদের অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি, বরং আরও শক্তিশালী করেছে। তাই বলা যায়, ইরান বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছে—দৃঢ় সংকল্প, শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে একটি দেশ কীভাবে প্রযুক্তিতে অগ্রণী অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।

প্রবন্ধকার
মো: মোবারক করিম খান
প্রভাষক আইসিটি
ফরিদগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজ