স্টাফ রিপোর্টার:
চাঁদপুরে প্রথমবারের মতো একটি বাগানে বিদেশি ২২ প্রজাতির উন্নত লংগানের বাম্পার ফলন হয়েছে। বিদেশি নানা জাতের আম চাষে ইতোমধ্যে আলোচনায় আসা চাঁদপুরের সদর উপজেলার শাহতলী গ্রামের ফ্রুটস ভ্যালি অ্যাগ্রো এবার লংগান চাষেও নতুন সাফল্য অর্জন করেছে। লিচুর মতো দেখতে উচ্চমূল্যের এ বিদেশি ফল দেখতে ও কিনতে প্রতিদিনই বাগানে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জনপ্রিয় লংগান চীনে ‘ড্রাগন আই’ নামে পরিচিত। খোসা ছাড়ানোর পর স্বচ্ছ সাদা শাঁসের মাঝখানে থাকা কালো বীজটি ড্রাগনের চোখের মতো দেখতে হওয়ায় এর এমন নামকরণ। মিষ্টি স্বাদ, মনোমুগ্ধকর সুগন্ধ ও উচ্চ পুষ্টিগুণের কারণে বিশ্ববাজারে ফলটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভর এই ফল এখন সফলভাবে উৎপাদিত হচ্ছে চাঁদপুরের মাটিতে।
চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহতলী গ্রামের একটি পরিত্যক্ত ইটভাটার বালুমাটিতে গড়ে ওঠা ফ্রুটস ভ্যালি অ্যাগ্রোতে বর্তমানে বিদেশি ৭৫ জাতের আমের পাশাপাশি থাইল্যান্ড, চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ২২টি উন্নত জাতের লংগান সফলভাবে ফল ধরেছে। যদিও এখনো বাজারজাত শুরু হয়নি, তবে বাগান কর্তৃপক্ষের আশা, আগামী জুলাই মাসের শেষ দিকে বাণিজ্যিকভাবে লংগান বাজারে আনা সম্ভব হবে।
বাগান পরিদর্শনে আসা ব্যবসায়ী সেলিম খান, ওয়াবায়দ উল্ল্যাহ ও ফাতেমা বেগম বলেন, দেশে বিদেশি ফল পাওয়া গেলেও অধিকাংশই আমদানিকৃত এবং রাসায়নিক সংরক্ষণে রাখা হয়। কিন্তু ফ্রুটস ভ্যালি অ্যাগ্রোতে উৎপাদিত ফল সম্পূর্ণ অর্গানিক হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
বাগানের পরিচর্যাকারী রাকিব হোসেন জানান, প্রতিটি লংগান জাতের আকার, স্বাদ, সুগন্ধ, ফলনের সময় এবং উৎপাদন বৈশিষ্ট্য আলাদা। কোনো জাত বড় আকৃতির, কোনোটি বেশি মিষ্টি, আবার কোনোটি দীর্ঘ সময় ধরে ফল দেয়। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় কোন জাত সবচেয়ে ভালো ফলন দেয় এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে, তা নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা চলছে।
ফ্রুটস ভ্যালি অ্যাগ্রোর উদ্যোক্তা হেলাল উদ্দিন বলেন, তাঁদের বাগানে শুধু বিদেশি আম বা লংগান নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা প্রায় ৩৭ প্রজাতির বিদেশি ফলের সংগ্রহ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৫টি দেশের ৭৫ জাতের আম, বিভিন্ন জাতের অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, পার্সিমন, ড্রাগন ফল, প্যাশন ফ্রুট, মাল্টা, কমলা, জাম্বুরা, ডালিম, আঙুর, থাই ও চাইনিজ লিচু, শরিফা, সফেদা, ক্যানিস্টেল (এগ ফ্রুট), স্টার অ্যাপল, জাবোটিকাবা, মালয় আপেল, ওয়াক্স অ্যাপল, বার্মিজ আঙুর, বিভিন্ন জাতের ফিগসহ বহু দুষ্প্রাপ্য ও উচ্চমূল্যের ফল। তিনি বলেন, তাঁদের লক্ষ্য শুধু নতুন ফল উৎপাদন নয়; বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে কোন বিদেশি ফল সবচেয়ে বেশি অভিযোজিত হয়, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করা। সফল জাতগুলো কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে বাণিজ্যিক চাষে উৎসাহিত করা গেলে ভবিষ্যতে বিদেশি ফল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
চাঁদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, একসঙ্গে বিদেশি ২২টি জাতের লংগানের সফল ফলন বাংলাদেশের ফল চাষে একটি ব্যতিক্রমী অর্জন। সঠিক জাত নির্বাচন, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, উন্নত পরিচর্যা এবং বাণিজ্যিক পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটাতে পারলে লংগান অদূর ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম লাভজনক উচ্চমূল্যের ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। পাশাপাশি এটি বিদেশি ফল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


