স্টাফ রিপোর্টার:
চাঁদপুরের সড়কে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন যেন দুই রকম চিত্র। একদিকে অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, মামলা ও আটক চলছে। অন্যদিকে যাত্রীবাহী বাস, ডাম্প ট্রাক ও মাইক্রোবাসের বিরুদ্ধে একই মাত্রায় অভিযান হচ্ছে কি না-তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে পুলিশের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে। একাধিক অভিযানে বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার খবরও এসেছে। তবে সড়ক দুর্ঘটনার ধারাবাহিক চিত্র বলছে, শুধু ছোট যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেই চাঁদপুরের সড়ক নিরাপদ হবে না।
গত পাঁচ বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে চাঁদপুরে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার কয়েকটিতে বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেক, বাসের ধাক্কা কিংবা ভারী যানবাহনের চাপায় মৃত্যুর বিষয় উঠে এসেছে।
২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর কচুয়ার কড়ুইয়া এলাকায় বিআরটিসি বাস ও সিএনজি অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তিন কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হন। একই বছরের ৩ ডিসেম্বর হাজীগঞ্জে যাত্রীবাহী বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে মোটরসাইকেলের তিন আরোহী নিহত হন।২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাবুরহাট-মতলব সড়কের বড়দিয়া এলাকায় মাইক্রোবাস ও সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে ৪জন নিহত হন। একই বছরের ২১ নভেম্বর চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের ঘোষেরহাটে বোগদাদ পরিবহনের বাসের ধাক্কায় সিএনজি অটোরিকশার এক স্কুলশিক্ষিকা নিহত হন।
২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঘোষেরহাটে বোগদাদ পরিবহনের বাস ও সিএনজি অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। একই বছরের ৩১ মার্চ চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কের গাছতলায় আনন্দ পরিবহনের বাসের ধাক্কায় একজন নিহত ও ৬ জন আহত হন।২০২৪ সালেও দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা থামেনি। ১৪ আগস্ট হাজীগঞ্জের বাকিলায় আইদি পরিবহনের বাসচাপায় মোটরসাইকেল চালক তৌহিদুল ইসলাম নিহত হন। একই দিনে বাকিলা বাসস্ট্যান্ডে বাসচাপায় শিক্ষার্থী নাইম হোসেন নিহত হন। বছরের শেষদিকে হাজীগঞ্জের বাকিলা এলাকায় বোগদাদ পরিবহনের বাসের ধাক্কায় জুলহাস খান নিহত হন।২০২৫ সালেও চাঁদপুরের বিভিন্ন সড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে। মে মাসে চাঁদপুর-কুমিল্লা মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে দুজন নিহত হন। ডিসেম্বর ফরিদগঞ্জে কাভার্ড ভ্যানের চাপায় একজন নিহত হন।
চলতি ২০২৬ সালেও পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়নি। মে মাসে শাহরাস্তিতে বালুবাহী ট্রাকের চাপায় রবিউল আলম নিহত হন। একই মাসে হাজীগঞ্জে সিমেন্টবাহী ট্রাকের ধাক্কায় আট বছরের শিশু মিম আক্তার নিহত হয়। আগস্টে শাহরাস্তিতে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে তিনজন নিহত ও ১৫ জন আহত হন।
এগুলো গত পাঁচ বছরের দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা নয়; জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি ঘটনা। তবে এসব ঘটনার ধরণ চাঁদপুরের সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।পুলিশের বর্তমান অভিযানের বড় অংশজুড়ে রয়েছে অবৈধ সিএনজি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল। এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান প্রয়োজনীয়। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে-বাসের ফিটনেস কতটা যাচাই হচ্ছে? রুট পারমিট পরীক্ষা কতটা হচ্ছে? ডাম্প ট্রাক ও বালুবাহী ট্রাকের বিরুদ্ধে কতটা অভিযান চলছে? মাইক্রোবাসের কাগজপত্রই বা কতটা যাচাই করা হচ্ছে?
বিশেষ করে বেপরোয়া গতিতে বাস চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেক এবং প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানোর অভিযোগও রয়েছে। দুর্ঘটনার বিভিন্ন ঘটনায় বাস, ট্রাক কিংবা অন্যান্য বড় যানবাহনের সংশ্লিষ্টতাও দেখা যাচ্ছে।চাঁদপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট বাবুরহাট-মতলব-ঢাকা। এই রুটের বাস চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রুট পারমিট ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানবলেন, মতলবের রোডে চলাচলকারী বাসগুলো ২০০৬ সালে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এবং এরপর আর অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, তিন পরিবহনের ১০টি বাসের অনুমোদনের বিপরীতে বর্তমানে দেড় শতাধিক বাস চলাচল করছে। অভিযোগটি সত্য হলে প্রশ্ন হচ্ছে-অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে এত বেশি বাস কীভাবে রাস্তায় চলছে? এসব বাসের কাগজপত্র কে যাচাই করছে? রুট পারমিট ছাড়া কোনো বাস চললে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পরিবহন খাতে আরও গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, একই রেজিস্ট্রেশন বা আইডি নম্বর ব্যবহার করে একাধিক বাস চলাচল করছে।
অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি শুধু পরিবহন অনিয়ম নয়, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও গুরুতর বিষয়। কারণ একটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর নির্দিষ্ট একটি গাড়ির পরিচয় বহন করে। বিআরটিএর নথির সঙ্গে প্রতিটি বাসের রেজিস্ট্রেশন নম্বর, চেসিস নম্বর, ইঞ্জিন নম্বর, ফিটনেস ও রুট পারমিট মিলিয়ে দেখলেই অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
চাঁদপুরে বাস দুর্ঘটনার কয়েকটি ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীরা বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ চালনার কথা জানিয়েছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাজীগঞ্জে বোগদাদ পরিবহনের বাসের ধাক্কায় জুলহাস নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে বাসটির বেপরোয়া গতির কথা উঠে আসে।
হাজীগঞ্জে বাসের চাপায় নানি-নাতনি নিহত হওয়ার আরেক ঘটনায়ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বাসটির দ্রুতগতিতে চলাচলের কথা জানিয়েছিলেন। তাই সচেতন মহলের প্রশ্ন হচ্ছে-শুধু কাগজপত্র ঠিক থাকলেই কি একটি বাসকে নিরাপদ বলা যায়?
বাসের গতি, চালকের দক্ষতা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেক, ব্রেক-টায়ার-লাইটের অবস্থা, অতিরিক্ত ট্রিপ এবং চালকের কর্মঘণ্টাও সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি এম.এ লতিফ বলেন, চাঁদপুরে পুলিশের মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এসব অভিযানের কারণে সড়কে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। অনেকেই এখন নিয়মিত হেলমেট পরছেন এবং যানবাহনের চালকরাও আগের তুলনায় অনেকটা সচেতন হয়েছেন।
তবে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ বড় ও ভারী যানবাহন। এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে পুলিশ ও প্রশাসনের তেমন দৃশ্যমান অভিযান আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আমরা চাই, দুর্ঘটনা রোধে বড় যানবাহনের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে এবং আমরা নিয়মিত অভিযান করছি। কিছুদিন আগে আমরা বেশ কয়েকটি বাস আটক করেছিলাম। পরে তারা কাগজপত্র ঠিক করে নিয়ে আসায় সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
মতলবের রোডে চলাচলকারী বাসের অনুমোদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মতলবের রোডে যে বাসগুলো, সেগুলো ২০০৬ সালে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এরপর আর অনুমোদন দেওয়া হয়নি।ডাম্প ট্রাকের বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ডাম্প ট্রাকের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান করছি। ভালোভাবে অভিযান করা হবে।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান জানান, অনুমোদনহীন কোন গাড়ি চলাচলের সুযোগ নেই। নতুন পুলিশ সুপার দায়িত্ব নেওয়ার পর সিএনজি ও মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে পুলিশের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে। এখন সাধারণ মানুষের প্রশ্ন-সিএনজি-মোটরসাইকেলের মতো বাস, ডাম্প ট্রাক ও মাইক্রোবাসের বিরুদ্ধেও কি একই মাত্রার দৃশ্যমান অভিযান হবে?
কাগজপত্রহীন সিএনজি আটক হলে কাগজপত্রহীন বাসের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা হওয়া উচিত। ফিটনেসবিহীন মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হলে ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।একইভাবে অনুমোদনের অতিরিক্ত বাস চললে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা এবং একই নম্বরে একাধিক গাড়ি চলার অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি উঠেছে।
চাঁদপুরে অবৈধ সিএনজি-মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোর অভিযান প্রয়োজনীয় এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু সড়ক নিরাপদ করতে হলে বড় যানবাহনের ক্ষেত্রেও একই কঠোরতা দেখাতে হবে।কারণ গত পাঁচ বছরের প্রকাশিত দুর্ঘটনার চিত্রে বারবার দেখা যাচ্ছে-বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস কিংবা অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষেও প্রাণ যাচ্ছে। কোথাও বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় মানুষ মারা যাচ্ছে, কোথাও বাস-সিএনজি সংঘর্ষে একসঙ্গে একাধিক প্রাণ ঝরছে, কোথাও ডাম্প ট্রাকের চাপায় শিশু কিংবা পথচারীর মৃত্যু হচ্ছে।
তাই এখন প্রশ্ন শুধু ‘অবৈধ সিএনজি কেন চলছে?’-এতে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই।প্রশ্ন হওয়া উচিত-ফিটনেসবিহীন বাস কেন চলছে? অনুমোদনের চেয়ে বেশি বাস চললে ব্যবস্থা কোথায়?একই নম্বরে একাধিক বাস চলার অভিযোগের তদন্ত হবে কি? বেপরোয়া গতির বাসের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান কোথায়? ডাম্প ট্রাক ও মাইক্রোবাসের বিরুদ্ধে বড় অভিযান কবে?


